একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, বিএনপিতে এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনাও বাড়ছে। দলটির নেতাকর্মীদের ঘুরে-ফিরে একটাই প্রশ্নÑ খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আগেই দলের বিভিন্ন ফোরামে সিনিয়রদের জানিয়ে দিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে তারা যাবেন না। এ অবস্থায় ঈদের আগে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কথা ওঠে। সেখানে খুলনা সিটি নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়। এ আলোচনায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নেতার মত ছিল, ’খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না।’ এসব নেতাই এতদিন যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। সোমবার অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এই ইস্যুতে কথা হয়েছে। সেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মনোভাব তুলে ধরেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারেক রহমান বলেছেন, দলের স্থায়ী কমিটি যখন যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার সঙ্গে তিনি থাকবেন। ঈদের আগে মির্জা ফখরুল লন্ডন সফর করেন। সেখানে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মনে করেন, চলমান অবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে লাভ হবে না; বরং সরকারকে বৈধতা দেওয়া হবে। নির্বাচনের মাঠ যদি তুলনামূলক সমতল হয়, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে। সবার আগে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের সুযোগ দিতে হবে। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমাদের সময়কে বলেন, বিএনপি হচ্ছে একটি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আমাদের মনোভাব ইতিবাচক। তবে নির্বাচন বলতে যা বোঝায়Ñ এমন নির্বাচন হলে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তো অবশ্যই যাব। সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম শর্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন মামলায় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। এর পর আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে। সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য ভোটের মাঠ সমতল হতে হবে।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, কিছুই দরকার হবে না, নির্বাচনের আগে সরকার সংসদ ভেঙে দিক। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন একটি সরকার গঠন করা হোক। সেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা স্পিকার যে কোনো একজন সরকারপ্রধান হলে বিএনপিরও আপত্তি থাকবে না। এ ক্ষেত্রে বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। আলোচনার বিকল্প নেই।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, সরকারের এখনকার যে মনোভাব, নির্বাচনের আগে তারা কোনোভাবে হারতে চায় না। সরকার মনে করে, বিএনপির কোনো দাবি মেনে নেওয়া মানেই নির্বাচনের আগে তাদের কাছে হেরে যাওয়া। সরকারও বোঝে, বিএনপির দাবিগুলো যৌক্তিক। সরকারের মনোভাব মাথায় রেখে কূটনৈতিকভাবে সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি।
নেতারা জানান, গুরুত্বপূর্ণ দেশের কূটনীতিকরাও চাচ্ছেন আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনীতিকরাও বিভিন্নভাবে দলটির নেতাদের প্রভাবিত করছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাইরে জিয়া পরিবারবিহীন বিএনপিকে নির্বাচনে চায়। এ লক্ষ্যে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কয়েক নেতাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে।
দলটির নেতাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ সরকার টিকে থাকার জন্য ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি। সে কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রশ্নে ভারত যাতে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকে, সে জন্য দলটির দায়িত্বশীল নেতারা কাজ করছেন। সহিংস পরিস্থিতি ছাড়া যাতে চলমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়, তারই অংশ হিসেবে ভারত সফর করেছে বিএনপির তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেন। এই সফরে তারা বাংলাদেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন। কূটনৈতিকভাবে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে রাজপথে আন্দোলনে নামবে বিএনপি। সে প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছে দলটি। তবে এখন শুধু ভারতের ওপর নির্ভর করে চলতে যাচ্ছে না বিএনপি। তবে বড় একটি অংশের মতামত হচ্ছে, ভারত বিএনপিকে কোনো ধরনের স্পেস দেবে না। তাই তারা সমানতালে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গেও তাদের দুই দফা ’সফল’ বৈঠক হয়েছে বলে নেতারা জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিএনপির উদ্দেশ্য ভারতকে বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে নিরপেক্ষ করা। দেশটির আস্থা অর্জনে এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তাদের ভাষ্য, বিএনপি ইস্যুতে ভারতের মনোভাবে পরিবর্তন আসবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, এই সরকার শিগগিরই কোনো দাবি মেনে নেবে না। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের যৌক্তিক দাবিতে রাজপথ ছাড়া বিকল্প নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সে আন্দোলনের প্রস্তুতিও আমাদের আছে। যে নির্বাচনে খালেদা জিয়া অথবা তারেক রহমান অংশ নিতে পারবেন না অথবা করবেন না, একই সঙ্গে শেখ হাসিনার অধীনে হবেÑ এমন নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।

সূত্র:amadershomoy