রমযান মাস। চারপা‌শে চল‌ছে ইফতার প‌া‌র্টি। এর ম‌ধ্যেই ফেসবু‌কে আজ একটা লেখা দেখছি, এ পি জে আবদুল কালাম কেন ইফতার পা‌র্টি দি‌তেন না।
এ পি জের স‌চিব পি মাধভান নায়ারের লেখা ’দ্য কালাম এফেক্ট, মাই ইয়ার্স উইথ দ্য প্রেসিডেন্ট’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০২ সালে। সেই লেখার সূত্র ধ‌রে ২০১৭ স‌া‌লের ১৭ জুন প্রথম আলোয় দারুণ একটা লেখা লি‌খে‌ছি‌লেন সাংবাদিক মিজানুর রহমান। ‌সেই লেখার সূত্র ধ‌রেই ফেসকু‌কে লেখা। লেখার শি‌রোনাম এ পি জে আবদুল কালাম কেন ইফতার পা‌র্টি দি‌তেন না।

ওই লেখায় বলা হ‌য়ে‌ছে, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টির রেওয়াজ বহুকাল ধরে চলে আসছে। সেই সঙ্গে সেখানে কাকে দেখা গেল, কাকে গেল না, কাকে দাওয়াত দেওয়া হলো, কাকে দেওয়া হলো না, সেদিকে মিডিয়ার সজাগ দৃষ্টি রাখা, এসব অনেকেরই জানা। কিন্তু একটা ছন্দপতন ঘটেছিল। আর সেটা ঘটিয়েছিলেন ড. এ পি জে আবদুল কালাম। তার আমলটি ছিল ইফতার পার্টিমুক্ত।

ঘটনা হ‌লো, ২০০২ সালে ড. আবদুল কালাম যখন রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েছিলেন, তখন রমজান মাস। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন্য এটা একটা নিয়মিত রেওয়াজ যে তিনি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন। একদিন ড. কালাম তাঁর সচিব মি. নায়রাকে বললেন, কেন তিনি একটি পার্টির আয়োজন করবেন? কারণ, এমন পার্টির অতিথিরা সর্বদা ভালো খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। তিনি মি. নায়ারের কাছে জানতে চাইলেন, একটি ইফতার পার্টির আয়োজনে কত খরচ পড়ে? মি. নায়ার তাঁকে জানালেন, প্রায় ২২ লাখ রুপি।

ড. কালাম তাঁকে নির্দেশ দিলেন, কতিপয় নির্দিষ্ট এতিমখানায় এই অর্থ, খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে। রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম এতিমখানা বাছাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। ড. কালাম এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। এতিমখানা বাছাইয়ের পরে ড. কালাম মি. নায়ারকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন এবং এক লাখ রুপির একটি চেক দিলেন। তিনি বললেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ দান করছেন। কিন্তু এ তথ্য কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। মি. নায়ার তখন বলেন, ’স্যার, আমি এখনই বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত, এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যে অর্থ তাঁর খরচ করা উচিত, শুধু সেটাই তিনি দান করেননি, তিনি সেই সঙ্গে নিজের অর্থও বিলিয়েছেন।’

ড. কালাম যদিও একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন; কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার বছরগুলোতে কোনো ইফতার পার্টি দেননি।



আমি আ‌গেও এ পি জে কালামা‌কে নি‌য়ে লি‌খে‌ছি। ড. কালাম তাঁর আত্মীয়দের একবার দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরা সবাই রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান নিলেন। তাঁদের নগর পরিদর্শন করাতে তিনি একটি বাস ভাড়া করলেন এবং সে অর্থ তিনি পরিশোধ করেন। কোনা সরকারি গাড়ি তাঁর আত্মীয়দের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। ড. কালামের নির্দেশনা অনুসারে, তাঁদের থাকা-খাওয়ার খরচ হিসাব করা হলো। বিল দাঁড়াল দুই লাখ রুপি, যা তিনি পরিশোধ করেছেন। ভারতীয় ইতিহাসে এটা আর কেউ করেননি।

এখানেই শেষ নয়, এবার বরং আরও নাটকীয়তার জন্য অপেক্ষা করুন। ড. কালাম একবার চাইলেন তাঁর সঙ্গে তাঁর বড় ভাই পুরো এক সপ্তাহ যাতে সময় কাটান। তা-ই হলো। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে তাঁর রুমভাড়া বাবদ তিনি অর্থ পরিশোধ করতে চাইলেন। কল্পনা করুন, একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এমন একটি কক্ষের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে চাইছেন, যা তাঁর নিজের জন্যই বরাদ্দ। এবারে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পূরণ হলো না। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফরা ভেবেছিলেন, এতখানি সততা অনুসরণ তাঁদের পক্ষে বিদ্যমান বিধির আওতায় সামাল দেওয়া কঠিন।

এবার ইফতার পা‌র্টি কর‌তে কর‌তে ভাবুন আমরা কোথায় আছি!

লেখক:অধিকারকর্মী
সূত্র:dhakatimes24