আগের সরকারের শেষ সময় সাংবাদিকদের প্রবল আপত্তির মুখে পাস করা হয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তখন আশ্বস্ত করা হয়েছিল, সাংবাদিকরা এ আইনের শিকার হবেন না। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। নির্বাচনের পর প্রথম সুযোগেই একজন তৃণমূল সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে, হাতকড়া পড়িয়ে আদালতে নিয়ে, রিমান্ডে নিয়ে কঠোর বার্তাই দিয়েছে- আগামী দিনগুলো সাংবাদিকদের জন্য সহজ হবে না।
আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ সবই হবে, রেহাই পাবে না সাংবাদিকরাও। আমি কখনোই দাবি করিনি, সাংবাদিকরা আইনের উর্ধ্বে। অপরাধ করলে তারা সাজা পাবেন প্রচলিত আইনেই। ব্যক্তিগত অপরাধ হলে তো কোনো কথাই নেই, তবে পেশাগত বিচ্যুতির ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করার আগে তদন্ত ও যাচাই করা উচিত। দেখতে হবে ভুলটি ইচ্ছাকৃত, নাকি পেশাগত অদক্ষতা। কিন্তু খুলনার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তাতে ঐ সাংবাদিকের কোনো দায় নেই। দায় যদি কারো থেকেই থাকে, তবে খুলনার রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলালের।

ইচ্ছাকৃত হোক আর অনিচ্ছাকৃত নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টাটা ঐ রিটার্নিং অফিসার করেছেন, কোনো সাংবাদিক নয়। বরং মামলা করে সরকার চিনিয়ে দিল খুলনায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিতদের মধ্যে কেবল এই দুজনই সত্যিকারের সাংবাদিকতাটা করেছেন, রিটার্নিং অফিসার যা ঘোষণা করেছেন তা সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন। বাকি যারা সেখানে উপস্থিত থেকেও সংবাদটি প্রজার করেননি বা নিজ নিজ অফিসে পাঠাননি বা পাঠালেও যাদের অফিস তা প্রচার করেনি; তারা আসলে সঠিক সাংবাদিকতাটা করেননি। তারা হয়তো সরকারের ভাবমূর্তির কথা ভেবেছেন, নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। তবে সাংবাদিকদের তো সেটা ভাবার কথা নয়।

সাংবাদিকদের কাজ হলো যে কোনো বিচ্যুতি তুলে ধরা। খুলনার রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হেলাল খুলনা-১ আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন। তাতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছিলেন ২ লাখ ৫৩ হাজার ভোট, ধানের শীষ প্রার্থীর ভোট ছিল ২৮ হাজার ১৭০। উপস্থিত এক সাংবাদিক ভুলটি ধরিয়ে দিয়ে বলেন, দুই প্রার্থীর ভোট মোট ভোটের চেয়ে ২২ হাজার বেশি। রিটার্নিং অফিসার সবার সামনে মাইকে অধস্তনদের বকাঝকা করেন। কিন্তু ফলাফল স্থগিত করেননি। মোট ভোটারের চেয়ে ২২ হাজার ভোট বেশি পাওয়ার খবরটি খুবই ইন্টারেস্টিং। বাংলাদেশের সব পত্রিকা অনলাইন, টিভিতে নিউজটি প্রচার হওয়ার কথা। কিন্তু হলো মাত্র দুটিতে- ঢাকা ট্রিবিউন আর মানবজমিন। ঢাকা ট্রিবিউন প্রতিনিধি হেদায়েত জোসেন মোল্লা ও মানবজমিন প্রতিনিধি রাশিদুল ইসলামই সাংবাদিকতাটা করলেন। মামলাও খেলেন। একঘণ্টা পর মোহাম্মদ হেলাল আবার খুলনা-১ আসনের ফল ঘোষণা করলেন। তাতে নৌকার প্রার্থীর ভোট ৭১ হাজার কমে গেল। কিভাবে? নৌকার প্রার্থী পঞ্চানন বিশ্বাস জিতেছেন এবং ভদ্রলোক বলে কিছু বলেননি। কিন্তু তিনি যদি সেই ৭১ হাজার ভোট ফেরত চাইতেন, তাহলে মোহাম্মদ হেলাল কী করতেন?

নিজে বাঁচতে রিটার্নিং অফিসার তার সহাকারীকে দিয়ে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করালেন। বছরের প্রথম দিনেই একজনকে গ্রেপ্তার করে, তাকে হাতকড়া পড়িয়ে আদালতে নিয়ে, রিমান্ডে নিয়ে সাংবাদিকদের বুঝিয়ে দেয়া হলো- সাবধান। খুলনা -১ আসনে ২২ হাজার ভোট বেশি পড়ার বিষয়টি খুব বেশি জানাজানি হয়নি। কিন্তু দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার পর দেশে এবং বিদেশে সবাই সেটা জানলো। কারণ সবার কৌতুহল, নির্বাচনের পরপর একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হলো কেন? কারণ তারা ২২ হাজার ভোট বেশি পড়ার খবরটি প্রচার করেছিলেন।

খুলনা-১ আসনের ভুল ফল করেছেন কে? রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হেলাল। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে ঘটনাটি সারাবিশ্বকে জানানোর ব্যবস্থা করলো কে? সহকারী রিটার্নিং অফিসার দেবাশীষ চৌথুরী। আর জেল খাটলেন সাংবাদিক। একেই বলে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে।

হেদায়েত মোল্লা ১১ দিনের জন্য জামিন পেয়েছেন বটে, কিন্তু মামলাটি এখনও আছে। অবিলম্বে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মোহাম্মদ হেলাল ও দেবাশীষ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অন্তত তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

(ফেসবুকে লিখেছেন প্রভাষ আমিন)
সূত্র:amadershomoy