সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেছেন, বৃহত্তর ভাবে যা পরিচিত গণমাধ্যম হিসেবে ইদানীং তার একটি বড় অংশ পরিচিত হয়েছে দলীয় মাধ্যম হিসেবে। এটা যে আগে ছিলো না, তা নয়। এখন তা বহু গুণে বেড়েছে। নোয়াখালির সুবর্ণচরে চার সন্তানের জননী একজন নারী, একজন মা কে নির্মমভাবে ধর্ষণের সংবাদটি গণমাধ্যম নামের অধিকাংশ দলীয় মাধ্যমই প্রকাশ করেনি। স্থানীয় সকল প্রতিনিধিদের কাছে এই সংবাদটি ছিলো কিন্তু কেউই প্রকাশ করেনি। তারা ঢাকায় পাঠিয়েছিলো কি না জানি না। একমাত্র ডেইলি স্টার প্রকাশ করেছিলো এবং গুরুত্ব দিয়েই করেছিলো। সংবাদটি তাদের নিউজ পোর্টলে প্রকাশের পর সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বেশকিছু মিডিয়া সংবাদটির আংশিক প্রকাশ করেছে। যার প্রেক্ষিতে দেখা যায় কর্তাব্যক্তিদের কিছু পরিচিত বক্তব্য ’অপরাধী সে যেই হোক ছাড় পাবে না, আইনের আওতায় আনা হবে’। ওই নারীর অপরাধ সে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে ভোট দিয়েছিলো। ২ জানুয়ারি ইউটিউবে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, সুবর্ণচরের এই ঘটনাটির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অনেকেরই বিবেক নাড়া দিচ্ছে না, টেলিভিশনে কোনো বিশেষ টকশোর আয়োজন করা হচ্ছে না, পত্রিকার পাতায় গুরুত্বসহকারে স্থান পাচ্ছে না। জাতির বিবেক হিসেবে যারা বা যিনি পরিচিত তিনি আবার এসব বিষয়ে কথা বলেন না। ঢাবির ছাত্র-ছাত্রীরা যখন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্ররা যখন হেলমেট বাহিনীর আক্রমণে আহত হয়েছে তখনও তার বিবেক নাড়া দেয়নি। রাবি ছাত্র তরিকুল নামের সেই ছেলেটিকে নির্মমভাবে হাতুড়িপেটা করা হলো তখনো সেই সব জাতির বিবেক তিনি বা তারা বা তাদের বিবেক নাড়া দেইনি। এই সমাজে যে বা যারা নিজেদেরকে জাতির বিবেক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সারাজীবন ধরে মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখেছেন, চেতনার গান গেয়েছেন, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শের কথা বলেছেন, তরুণদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আর এই বাস্তবতায় তিনি বা তারা যে সার্টিফিকেট বিতরণ করছেন সেটা পূর্বে লিখিত গল্প-উপন্যাসের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। অনেকেই প্রশ্ন করছেন তিনি কেন এসব কথা বলছেন বা এমন কোনো কথা বললেন না? এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি-আপনি, আমরা তাদেরকে চিনতে ভুল করেছি। যেভাবে তাদেরকে জেনেছিলাম সেটা তাদের আসল পরিচয় ছিলো না। এখন আমি-আপনি তাদের যেভাবে দেখছি এটাই তাদের আসল পরিচয়। জাতির বিবেক সেজে যারা এদেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করছেন তাদের চিনে রাখা প্রয়োজন।
অভিযোগ আছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত অভিযুক্ত রুহুল আমিনের নির্দেশেই এই নারকীয় কা-টি সংগঠিত হয়। অথচ ঘটনার পর মামলা দায়ের করার সময় পুলিশ সুকৌশলে মূল অভিযুক্ত রুহুল আমিনকে আসামি তালিকার বাইরে রেখে মামলা দায়ের করেছে। এখন শাস্তির দাবি তুলে অনেকেই অনেক কথা বলছে, কিন্তু মূল অভিযুক্তকে বাদ দিয়ে কেন মামলাটি করা হলো এই প্রশ্নটি উঠে আসছে না। কোনো কোনো সময় কোনো কোনো নারীকে যদি অসম্মান বা নির্যাতনের শিকার হয়। তাহলে আমাদের সমাজের একটি অংশ বিশেষভাবে সোচ্চার হোন। এটা সমাজের জন্য একটা ইতিবাচক দিক। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা আমরা দেখেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় এই যে কোনো ঘটনা দেখে এবং বোঝার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে ইতিবাচক হলে তবেই আমরা সোচ্চার হই। তাছাড়া আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না বলে মন্তব্য করেছেন এই সাংবাদিক।

গোলাম মোর্তোজা আরও বলেন, যাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করার কিছু নেই তাদের দিকে তাকিয়ে না থেকে সোচ্চার আমাদেরকেই হতে হবে। যা কিছু সত্য, সুন্দর, মঙ্গলজনক তার পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশ কখনোই ধর্ষকের হতে পারে না। যে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল ধর্ষকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে তাদের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে। ইয়াসমিন, পূর্ণিমাদের যারা নির্যাতন করেছিলো, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অবস্থান নিয়েছিলো। আজ সুবর্ণচরের এক মায়ের সম্মানের দাবিতে জনসাধারণকেই আবার অবস্থান নিতে হবে। হাল ছাড়ার কোনো কারণ নেই, হতাশ হওয়ারও কোনো কারণ নেই, বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানে। যার ফলেই আজকের এই বাংলাদেশ।