নির্বাচনী সহিংসতায় দেশের ১২ জেলায় এ পর্যন্ত ১৭ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এ সংখ্যা হয়তো আরও বাড়তে পারে। এই মৃত্যু কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ধরা যাবে না। যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় বড় ব্যাপার নয়। হতে পারে নিহত ব্যক্তিরা সরকারি দলের বা বিরোধী দলের। তাঁরা মারা গেছেন সংঘর্ষে, একজন পদদলিত হয়ে। এটিই বড় কথা। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি কোনোভাবেই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়।
দক্ষিণাঞ্চলে আমার দাদাবাড়ি আর নানাবাড়ি থেকে যেসব তথ্য পেয়েছি, তাতে সেখানকার মানুষ আতঙ্কিত। নির্বাচনের পর এখন কী হবে, সেটিই তাদের আতঙ্কের বিষয়। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ভোট দিতে যাননি। প্রাথমিকভাবে যেসব তথ্য পেয়েছি, তাতে দেশের সব জায়গায় না হলেও যেসব জায়গায় সংঘর্ষ ও প্রাণহানি হয়েছে, তা কাম্য ছিল না।

ইতিমধ্যে দুজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তাঁরা রাজধানীর যে দুই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন, সেখানে বিরোধী ও অন্যান্য দলের এজেন্ট পাননি। ঢাকা শহরে যদি বিরোধীদের এজেন্ট না থাকে, তাহলে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি কী হয়েছে, সেটি ভাবার অবকাশ আছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঢাকার পরিস্থিতি এই হলে বিরোধীদের এই অভিযোগ আমলে না নিয়ে পারা যায় না।

এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমাদের হাতে নেই। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ভোটের বাস্তব চিত্র সেভাবে প্রচারিত হয়নি। অন্যবার ভোটের সময় আমরা নির্বাচনের দিনের তাৎক্ষণিক চিত্র টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখেছি। তা দেখে নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা পেয়েছি।

টেলিভিশনগুলোতে যে এবার সেভাবে ভোটের চিত্র প্রচারিত হলো না, তার কী কারণ, আমরা জানি না। হতে পারে নির্বাচন কমিশনের বারবার সিদ্ধান্ত বদলের কারণে হয়তো কেন্দ্রের ভেতরে টেলিভিশন ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তাদের হয়তো কেন্দ্রের ভেতরে সেভাবে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

ভোটের ঠিক আগে গভীর রাতে সংঘর্ষ হয়েছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। আমার আত্মীয়স্বজনের বড় অংশ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে থাকেন। তাঁদের কাছ থেকে তো বটেই, অন্যদের কাছ থেকেও নানা খবর পেয়েছি। তাঁরা ভোটের দিন সকালবেলায় জানিয়েছেন, রাতের বেলাতেই কিছু হয়ে গেছে। আর যাঁরা দিনের বেলায় ভোট দিতে গেছেন, তাঁদের অনেকে সরকারি দলের ব্যক্তিদের সামনেই ভোটের সিল মারার মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সেসব এলাকায় এখন কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। সেসব জায়গার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন, ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

দেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ রকম ঘটনার কথা শুনতে হয়, তাহলে তো আমরা বলতে পারি না যে দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়েছে। দেশের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কী দাঁড়ায়, তা এখনই বলা কঠিন। বর্তমান সরকার দেশে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করেছে। শান্তিপূর্ণ ভোট উৎসব হলে জনগণ হয়তো তাদেরই ভোট দিত। তারাই হয়তো জয় পেত। কিন্তু অতি উৎসাহী প্রার্থীরা কোনোভাবেই হারতে চান না। তাঁদের কারণে হয়তো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো অবশ্য আমাদের কাছে আসেনি।

এবারের নির্বাচনে আরেকটা বিষয় দেখেছি, সেটি হলো কোনো কোনো ফাঁকা কেন্দ্রের বাইরেও ভোটারের দীর্ঘ লাইন। এটা কোনো কাম্য বিষয় নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় কেন্দ্রের বাইরে ১৪৪ ধারা জারি করে আমরা বলেছিলাম, কেন্দ্রের বাইরে ভিড় করা যাবে না। প্রকৃত ভোটাররাই শুধু কেন্দ্রে আসবেন। কেন্দ্রে ঢুকে ভোট দিয়েই আবার বেরিয়ে যাবেন। ভোটের দিন সকালবেলায় রাজধানীর পাশেই কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বাইরে শত শত ভোটার দীর্ঘ লাইনে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাঠপর্যায়ের যাঁরা এসব ঘটনা ঘটান, তাঁদের উদ্দেশ্য কী, সেটা বোধগম্য নয়। এ ধরনের ঘটনায় মানুষের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।