মাত্র ৬ বছরের ব্যবধানে ১২ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে ঠেকেছে সিজারিয়ান। প্রায়শই চিকিৎসক ও প্রাইভেট হাসপাতালের মুনাফার কাছে বলি হচ্ছে নবজাতক ও মায়েরা। শুধু তাই নয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নানান জটিলতায় পড়তে হচ্ছে দেশের লাখো মায়েদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা সমাধানে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যদিও অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ঠেকাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী নিয়োগের বাইরে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।
ভুল চিকিৎসায় মেয়ের মৃত্যুর দুর্ঘটনা আজও মানতে পারছেন না মা। গেল বছর ঢাকার নবাবগঞ্জের পাড়াগ্রাম হাসপাতালে প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন নুরুন্নাহার। ডাক্তার আসবে বলে আশ্বাস দিয়ে কর্তব্যরত নার্সরাই নুরুন্নাহারের শরীরে অস্ত্রোপচার চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ পরিবার ও প্রশাসনের। হাসপাতাল মালিকের মুনাফার লোভ আর কর্তব্যরতদের অন্যায় সিদ্ধান্তের কাছে নুরুন্নাহারের সঙ্গে বলি হয় ফুটফুটে নবজাতকও।

নুরুন্নাহারের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তার প্রসব বেদনা শুরুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়, ডাক্তার আসবেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর নার্সরাই অস্ত্রোপচার চালান।

দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই নানান ভয় ভীতি দেখিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে সিজারিয়ান প্রসবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্ররোচনায় অনেকক্ষেত্রে আলট্রাসনোগ্রামেও দেখানো হচ্ছে মিথ্যা তথ্য। নরমাল প্রসবে প্রবল ইচ্ছে থাকায় কেউ কেউ বেঁচে গেলেও অর্থ ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অধিকাংশই।

চিকিৎসকরা অনেক সময় সিজারিয়ানের তাগিদ দেন বলে অভিযোগ করে কয়েকজন বলেন, ডাক্তার অনেক সময় বলেন, এই সমস্যা, ওই সমস্যা হয়েছে। সিজার না করলে খুব সমস্যা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নরমালেই সুস্থভাবে সন্তানের জন্ম হয়েছে।

স্বাস্থ্য বুলেটিনের সর্বশেষ জরিপে, গেল ৬ বছরে দেশে সিজারিয়ানের হার বেড়েছে প্রায় ৩ গুণ। তবে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে এ হার ৮৩ ভাগ অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি। এবং এ কারণেও ৬ বছরে প্রসবকালীন মাতৃ মৃত্যুহার লাখে ২ জন করে বেড়ে হয়েছে ১৯৬ জন।

এ বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক ডা. সাহালা খাতুন বলেন, কিছু কিছু চিকিৎসকের কাজই হচ্ছে এজেন্ট দিয়ে রোগী ধরে এনে সিজার করান। পলিসি মেকারদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে সিজারিয়ানের হার কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি শিগগিরই উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ধাত্রীবিদ্যার ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০০ নার্স নিয়োগের আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাতৃ স্বাস্থ্য বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, আমরা উপজেলা পর্যায়ে ধাত্রীবিদ্যার ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০০ নার্স নিয়োগ দিচ্ছি। যখন সেখানে নরমালে শিশু জন্মের পরিমাণ বাড়বে তখন সিজারিয়ানের সংখ্যা কমে যাবে।

বর্তমানে বছরে প্রায় ১০ লাখ সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে। অস্বাভাবিক সিজারিয়ান বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।