ছয় মাস মেয়াদি আমানত রাখলে সাড়ে ৮ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক। এক বছর মেয়াদি আমানতে মিলছে সাড়ে ৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ মুনাফা নির্ধারিত আছে ব্যাংকটির মুদারাবা হজ প্রকল্পে। আর ৬ মাস মেয়াদি আমানতে সাড়ে ৮ শতাংশ এবং তিন মাস মেয়াদি আমানতে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ। আমানতের সুদহার বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকটি এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বিতরণ করছে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে। আবাসন ও ব্যক্তিগত ঋণে সুদ নিচ্ছে ১৬ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংকটির সুদহার নির্ধারিত আছে ২৪ শতাংশ। অথচ ২০১৭ সালেও ব্যাংকটি এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ করেছিল। আর আমানত নিয়েছে ৬ শতাংশের কম সুদে।
চতুর্থ প্রজন্মের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকে টাকা রেখে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ মিলছে। পাঁচ বছর মেয়াদি আমানতের ওপর এমন সুদ দিচ্ছে ব্যাংকটি। আর বিশেষ সুবিধার আওতায় সাত বছরে দ্বিগুণ এবং ১১ বছরে তিনগুণ প্রকল্পে টাকা রাখলে পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ১০ শতাংশ সুদ। এভাবেই ব্যাংকটিতে আমানত রেখে মিলছে ডাবল ডিজিট বা দুই অঙ্কের হারে সুদ। ব্যাংকটি প্রকল্প ঋণ দিচ্ছে সাড়ে ১২ শতাংশ সুদে। এসএমই খাতে ঋণে সুদহার ১৫ শতাংশ। আবাসন খাতে ও ব্যক্তিগত ঋণ বিতরণ করছে ১৫ শতাংশ সুদে। শুধু এক্সিম বা সাউথ বাংলা ব্যাংক নয়, অধিকাংশ ব্যাংকের চিত্র এ রকম। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক ইউসিবিএলে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিয়ে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে বিতরণ করছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিচ্ছে। সমস্যায় থাকা এবং নতুন ব্যাংকগুলোর সুদহার তুলনামূলক বেশি।

২০১৮ সালের শুরুর দিকে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়তে থাকায় তা কমানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। সুদহার কমানোর জন্য গত বছর ব্যাংকগুলোকে একের পর এক সুবিধা দেওয়া হয়। সব সুবিধা বহাল থাকলেও কোনো ব্যাংক ঘোষণার আলোকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ না করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় বাধা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও সুদহার না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়ে ১৬ শতাংশ সুদে বিতরণ করার কারণ জানতে চান তিনি। ব্যাংক খাতের উচ্চ সুদ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেক আগ থেকেই নানা অসন্তোষ রয়েছে।

সুদহার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা বলছেন, যে পরিমাণ আমানত আসছে, ঋণের চাহিদা রয়েছে তার চেয়ে বেশি। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত নিতেই ৯ শতাংশ বা তার বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার রয়েছে দুই অঙ্কে। আবার ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাত বা এডিআর কমানোর চাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর সুদহার বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আন্তঃব্যাংক কলমানি থেকে বড় অঙ্কের ধার করে চলছে কিছু ব্যাংক।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর কিছু টাকা বাজার থেকে উঠে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ আশানুরূপ আদায় হচ্ছে না। নতুন করে অনেকে খেলাপি হচ্ছে। এর মধ্যে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে মাত্র ৯ শতাংশ সুদে দীর্ঘ মেয়াদে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ঘোষণার পর কিছু গ্রাহক ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রেও উচ্চ সুদ বহাল আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানের এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। খবর সমকাল।

বাড়তি চাহিদার কারণে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সুদহার বাড়তির দিকে ছিল। তখন সুদহার কমানোর কথা বলে বিভিন্ন সুবিধা নেয় ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির সঙ্গে গত বছরের ১ এপ্রিল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক বৈঠক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত হয়। সিআরআর কমানোর ফলে বিনা সুদে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাখার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পায় ব্যাংকগুলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া ’রেপো’ সুদহার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়। এ ছাড়া সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এর আগের বছর ব্যাংকের মুনাফার ওপর কর পরিশোধের হার সাড়ে ৪২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার আলোকে গত ২০ জুন ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেওয়ার ঘোষণা দেয়। যদিও আজ অবধি ঘোষিত সুদহার কার্যকর হয়নি।

সূত্র:সমকাল