বাংলাদশী কাজী ফৌজিয়া যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিটি সেইফটি অ্যাক্ট পাস ও অভিবাসী জেলখানায় অনশন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীদের জন্য লড়াই করছেন। নিজে আইনি লড়াই করে মুক্ত করেছেন ৪৭ বাংলাদেশিকে। সম্প্রতি মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে গিয়ে মারা যান সাত বাংলাদেশি। ফৌজিয়া দেশে তাদের লাশ পাঠিয়েছেন অনেক লড়াই করে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া অভিবাসী, মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের কাছে আটক হওয়াদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনা, যারা পুলিশ বা সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যান তাদের লাশ দেশে পাঠানো, বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া, ন্যায্য মজুরি আদায় এবং সব আপদে-বিপদে পাশে থাকেন তিনি। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে অবৈধ অভিবাসীদের কাছে এক আপন মানুষ হয়ে উঠেছেন তিনি।
বাংলাদেশের মেয়ে কাজী ফৌজিয়া তার সাহসিকতার জন্য এরই মধ্যে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের উইমেন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি পেয়েছেন ’ইমিগ্র্যান্ট হ্যারিটেজ অ্যাওয়ার্ড’। এ পুরস্কার পাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র নারী তিনি। ২০১৪ সালে পেয়েছেন সাউথ এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড। ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক মেয়র অফিস ওমেন্স হিস্ট্রি মান্থ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে তাকে। ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক ওয়ার্কার ফেডারেশন ওয়ার্কার মুভমেন্টের জন্য ওমেন্স লিডার অ্যাওয়ার্ডও দেয় তাকে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন সেশনে ’অভিবাসন ও নগরী’ নিয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীদের পুলিশে আটক করা হলে থানায় ছুটে যান কাজী ফৌজিয়া। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির অধিকার আদায়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাগজপত্র ঠিকমতো না থাকলে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করতে হয়। ধরা পড়লে হাজতে দেয় পুলিশ। অবৈধ শ্রমিকদের ঠকানো হয়। আবার বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কোনো ব্যক্তির কাগজ হারিয়ে গেলে তাকেও একই রকম অবস্থার শিকার হতে হয়। এসব মানুষের পাশে থাকেন তিনি।

সাহসী ও উদ্যমী কাজী ফৌজিয়া ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত ’ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটরস লিডারশিপ’ প্রোগ্রামে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। লিডারশিপ প্রোগ্রাম শেষে তিনি লস অ্যাঞ্জেলস, টেক্সাস, ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশি কমিউনিটি উদ্যোক্তাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। আপনজন বলতে কেউ ছিল না তার। জ্যাকসন হাইটসের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নেন। দৈনিক ৫৫ ডলারে সেলাইয়ের কাজ। সপ্তাহে চার বা পাঁচ দিন কাজ হয়। ২০১৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন সুবিধা লাভ করেন। তখন জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা ও কুইন্সে শাড়ি বিক্রির দোকান দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ডেসিস রাইজিং আপ অ্যান্ড মুভমেন্ট (ড্রাম)-এর সদস্য হিসেবে ২০০৯ সালে কাজ শুরু করেন। পরে স্টাফ লিডার নির্বাচিত হন। এখন তিনি ড্রামের অর্গানাইজিং ডিরেক্টর মানে সাংগঠনিক পরিচালক।

কাজী ফৌজিয়ার নেতৃত্বে সম্প্রতি একটি আন্দোলন সফল হয়েছে। বৈধ, অবৈধ নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিল পাস হয়েছে স্টেট সিনেটে। প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশিসহ সাড়ে সাত লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসীর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে এতে। এ বিষয়ে নিউইয়র্কে হলুদ ট্যাক্সিচালক ময়মনসিংহের শ্যামগঞ্জের রফিক আহমেদ বলেন, ’কাজী আপা না থাকলে এ আইন পাস হতো না। কাজী আপা বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছে একজন মায়ের মতো। সবাই তার কাছে ছুটে যায়।’

এ বিষয়ে কাজী ফৌজিয়া বলেন, ’এ বিলটি পাসের জন্য ৫২ বার ডাইভারসিটি প্লাজায় র‌্যালি করতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কট্টর অবস্থানে লাখ লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসী সদা সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করছেন। এখন তারা ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলে নির্ভয়ে কর্মস্থলে যাতায়াত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ সবকিছু করতে পারবেন। এ ছাড়াও অবৈধ অভিবাসীরা যখন ডিএমভি (ডিপার্টমেন্ট অব মোটর ভেহিক্যাল) অফিসে লাইসেন্সের জন্য যাবেন, তখন ফেডারেল এজেন্টরা (ইমিগ্রেশন) তাদের ধরতে পারবে না। এ ছাড়া দুই বছর আগে জ্যাকসন হাইটসের বাউল দাদা বা ঝালমুরি দাদার খাবার ফেলে দিয়েছিল হেলথ ডিপার্টমেন্ট। মামলা করেছিলাম, দুই বছর পর মামলায় জিতেছি। এ মামলায় জয়ী হওয়ায় কয়েকশ’ বাংলাদেশি অভিবাসী ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।’

বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক এখন থাকেন জ্যাকসন হাইটসে। তিনি বলেন, ’জাতিসংঘের একটি সম্মেলনে এসে আর দেশে ফেরত যাইনি। বন্ধুদের কাছে কাজী আপার অনেক কথা শুনি। তারপর তার সঙ্গে দেখা করে একটি কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলি। তিনি একটি গ্রোসারি শপে কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’ আরও একজন সাংবাদিক বলেন, ’যখন কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি, তখন কাজী আপা তার প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে কাজ দিয়েছেন। এখানে আমরা যারা পরিবার নিয়ে থাকি, তারা ঈদে-আনন্দে, সমস্যায় কাজী আপার বাসাই আমাদের ঠিকানা।’

২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর দুর্ঘটনার শিকার হন কাজী ফৌজিয়া। পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দেয় তাকে। ডান কাঁধে ছয়টি ফাটল ধরা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য জরুরি সেবা থাকলেও সেদিন তিনি তা পাননি। ইন্স্যুরেন্স কাগজ না থাকায় ক্লিনিকেও সেবা পাননি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, অবৈধ হওয়ার কারণে হসপিটাল আমার পুরো চিকিৎসা করেনি। এ ঘটনা আমার জীবনের মোড় বদলে দেয়। আমি ভেবেছিলাম, কিছুদিন থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসব; কিন্তু এই বৈষ্যমের প্রতিকার করতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিই। নিউইয়র্কের পুলিশ বিভাগের জবাবদিহির চারটি বিল নিয়ে কাজ করি। কোর্টে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরি। শিক্ষার সমঅধিকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের সামনে অবরোধ কর্মসূচি করেছি। কর্মসূচিতে ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায়, বিখ্যাত লেখক কর্নেল ওয়েস্ট, মেয়র ডি ব্লাজিও এবং স্টেট সিনেটর জেসিকা রামোস আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমার কাজ সাউথ এশিয়ান ওয়ার্কিং ক্লাস ইমিগ্রেন্টদের জন্য, যার ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশি। যেসব বাচ্চা বাবা-মায়ের হাত ধরে আমেরিকায় এসেছিল, কাগজ নেই তাদের, এমন শিশুদের বৈধতা দেওয়ার নির্বাহী আদেশ আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করি। ২০১২ সালে ওবামা প্রশাসন এ আদেশ জারি করে।’

কাজী ফৌজিয়া বলেন, অভিবাসীদের সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। না জানি কখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় সব অভিবাসীর জন্য আরও কার্যকর নীতিমালা তৈরির সংগ্রাম করে যাচ্ছি। নিউইয়র্কের পুলিশ কর্তৃক মুসলমানদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করছি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ভালো মজুরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ক্রেতাদের দায়িত্বশীল হওয়ার বিষয়ে সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্টে অভিবাসীদের বিপদে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলি। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি অভিবাসীর অধিকারের জন্য। অভিবাসীরা জাতে তাদের ন্যায্য অধিকার পায়। আমরা কালো আর বাদামি বর্ণের মানুষরা বদলে দেব যুক্তরাষ্ট্রে। সত্যিকার অর্থে বর্ণ-বৈষম্যহীন মানবিক দেশ হবে যুক্তরাষ্ট্র।