কাজান রাশিয়ার অন্তর্গত তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। এটি রাশিয়ার ৬ষ্ঠ সর্বাধিক জনবহুল শহর। এর জনসংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ ৪৩ হাজার। কাজান শহরটি ভোলগা নদী এবং কাজানকা নদীর সঙ্গমস্থলে রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে অবস্থিত। কাজানের নগরদুর্গ বা ক্রেমলিনটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ২০০৯ সালে কাজানকে রাশিয়ার ৩য় রাজধানী মার্কাটি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়। একই বছর এটিকে রাশিয়ার ক্রীড়া রাজধানী উপাধি দেওয়া হয়। এবং আজও নগরটিকে এই উপাধি দিয়ে উল্লেখ করা হয়। কাজানে ২০১৫ সালে ২১ লক্ষ পর্যটক বেড়াতে আসেন। কাজান নগরদুর্গ এবং শহরের হোটেল-বিনোদন ভবন ও স্থাপনাসংগ্রহ যার ডাকনাম "কাজান তটভূমি" পর্যটকদের প্রধান দুই আকর্ষণস্থল। সম্প্রতি, ২৩ থেকে ২৬ আগস্ট রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতা। ১৯৫০ সালে স্পেনের মাদ্রিদে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতার ৪৫তম আসরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। বিশ্বের এক হাজার ৩৫৪ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের তানজিম তাবাস্‌সুম ইসলাম ও নাফিসা সাদাফ আঁচল। আন্তর্জাতিক দক্ষতামান নির্বাচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে বেস্ট অব নেশন অ্যাওয়ার্ড জয় করেছেন আঁচল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা দুই প্রতিযোগী ২ সেপ্টেম্বর শুনিয়েছেন তাদের সাফল্য ও স্বপ্নযাত্রার কথা।
দক্ষতার গ্রামে ইচ্ছেঘুড়ি
২৩ থেকে ২৬ আগস্ট মূল প্রতিযোগিতা শুরু হলেও আগেই প্রতিযোগীরা পৌঁছে যায় বিশ্ব দক্ষতা গ্রামে। এই গ্রামে কোনো কাঁচা ঘরবাড়ি নেই। দক্ষরাই তৈরি করেছেন পাঁচতলা বাড়ি। ত্রিশটি বাড়ি নিয়ে একটি গ্রাম। আছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতায় আসা বিশ্বের মোট এক হাজার ৩৫৪ প্রতিযোগী এই গ্রামটিকে নিজেদের করে নিয়েছে। করবে না-ই বা কেন। কাজান রাশিয়ার যে অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত সেই তাতারাস্তান রাজ্যের প্রেসিডেন্ট এসেই যে প্রতিযোগীদের গ্রাম বুঝিয়ে দিয়েছেন। ২৭ তারিখ পর্যন্ত এই গ্রাম প্রতিযোগীদের। তারা নিজেদের মতো গ্রাম সরব করে তুলেছে। ফান জোন গড়ে সেখানে বিরতিহীন করে আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়। এ ছাড়া সাইক্লিং, স্কেটিং, ব্যাডমিন্টন যে যার মতো খেলছে। এ যেন এক স্বপ্নের ইচ্ছে গ্রাম। ওদিকে লেজার শো আর কনসার্ট তো লেগেই আছে। গ্রামের বাসিন্দারা যেন ইচ্ছেঘুড়ি হাতে পেয়েছে। এই আনন্দ প্রতিযোগীদের অন্যরকম উস্কানি দেয়। তারা যেন আনন্দ-আড্ডায় নিজেদের আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। ইচ্ছে গ্রাম থেকে প্রতিযোগিতার ভেন্যুর দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

সম্পর্কের চারাগাছ
বিশ্ব দক্ষতা গ্রামে পতপত করে ওড়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। বাংলাদেশ ছাড়াও ৮১টি দেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় গ্রামে, ভেন্যুতে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে লাগানো হয় একটি গাছ। সম্পর্কের এই চারাগাছ বেড়ে উঠবে কাজানের আলো হাওয়া গায়ে মেখে। আর জপ করবে বাংলাদেশের নাম। দূর থেকে এই গাছ সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি তাড়া দেবে দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলার। একদিন যারা পৃথিবী জয় করবে শুধুই দক্ষতার জোরে।

পৃথিবী দেখল লাল-সবুজের দক্ষতা
২৩ আগস্ট ঘণ্টা বাজল দক্ষতা লড়াইয়ের। প্রস্তুত আমাদের দুই প্রতিযোগী তানজিম তাবাস্‌সুম ও নাফিসা সাদাফ। তাদের মধ্যে তানজিম লড়বেন কনফেকশনারি ও পেটিসেরিতে। আর নাফিসা সাদাফ ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে। ধাপে ধাপে তারা তাদের দক্ষতা দেখিয়ে সময়মতো শেষ করলেন প্রতিযোগিতা। এর ভেতর চলছে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ আড্ডাও। বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব। প্রতিযোগিতা দেখতে আসা মানুষও গড়ে তুলছে তাদের সঙ্গে সখ্য। তবু মনে ধুকপুকানি। যত সময় যাচ্ছে ততই বাড়ছে এর তৎপরতা। হঠাৎ মঞ্চ থেকে ঘোষণা এলো নাফিসার নাম। তিনি বাংলাদেশের দু’জনের একজন হিসেবে অর্জন করলেন বেস্ট অব নেশন অ্যাওয়ার্ড। দেখালেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দক্ষতামান। নির্বাচকদের পাশাপাশি প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশ্বের।

তাবাস্‌সুম ও নাফিসার গল্প
রাজধানীর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ করছেন তানজিম। বাড়ি বিক্রমপুরে হলেও জন্ম মোহাম্মদপুরে। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা তানজিম শখ করে কেক বানাতেন। সেই শখই যে একদিন তাকে কাজান টেনে নিয়ে যাবে, তা ভাবেননি কখনও। এইচএসসি শেষ করে কেক বানানোর ওপর দু-একটি কোর্সও করেন। একদিন জানতে পারলেন বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ’রাইজিং স্টার স্কিলস কম্পিটিশন-রোড টু কাজান’-এর কথা। তারপর নাম লেখালেন প্রতিযোগিতায়। পাড়ি দিলেন স্বপ্নের পথ।

নাফিসা সাদাফ আঁচলের বাড়ি বগুড়া শহরের খান্দার বাজারে। এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হয়েছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটিতে। পড়ছেন ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টে। ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে ভালো কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই ভর্তি হয়েছেন পছন্দের বিষয়ে। ২০১৮ সালের জুন মাসে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতা হয়। সেই প্রতিযোগিতায় সেরা পাঁচে উঠে আসে আঁচলের নাম। এই প্রতিযোগিতা মূলত বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয়। নাফিসার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আয়োজন করা হয়। প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচজন করে বাছাইয়ের পর চূড়ান্তভাবে ফের পাঁচজন বাছাই করে নেয় বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। সেই পাঁচজনের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন আঁচল। তানজিম পাঁচজনেরই একজন।

রোড টু কাজান
যাচাই-বাছাইয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পেয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগীদের। যদিও তারা আটটি ট্রেডে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে পায় মাত্র দুটি ট্রেডের প্রতিযোগী। তবু সান্ত্বনা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতায়। শুরু হয় গ্রুমিং। দুই প্রতিযোগীকে প্রায় পাঁচ মাসে গড়ে তোলা হয় কাজানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতার জন্য।

অংশ নিতে পারেন আপনিও
রোড টু কাজানের মতো আগামীতেও বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নন কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী আয়োজন করতে যাচ্ছে দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিযোগিতা। এবার আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নয়। প্রতিযোগী খোঁজা হবে উপজেলা থেকে। তারপর জেলা পর্যায় হয়ে বিভাগীয় এবং সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ীদের নিয়ে যাওয়া হবে আগামী ২০২১ সালে চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড স্কিল কম্পিটিশনে। এ ছাড়া ২০২০ সালে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড স্কিল কম্পিটিশনের এশিয়া পর্বেও অংশগ্রহণ করবে নির্বাচিতরা। ওয়ার্ল্ড স্কিল কম্পিটিশনে অংশগ্রহণের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগীদের বয়স হতে হয় ২২ বছরের মধ্যে। যোগ্যতা আর বয়স আপনার হাতের নাগালে থাকলে নাম লেখাতে পারেন আপনিও।

স্বপ্ন ওড়ে দেশের আকাশে
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে দেড় কোটি কর্মসংস্থান তৈরির সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা, সেজন্য কাজ করছি আমরা। যারা দেশের বাইরে এবং দেশে কাজ করতে চায় তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের কাজ। এ ছাড়া কাজের কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি বৈশিষ্ট্যের দক্ষতা, আচার-আচরণ এবং প্রয়োজনে বিদেশি ভাষাও শেখাচ্ছি আমরা। রাশিয়ার কাজানে আমরা আমাদের অবস্থান জানান দিতে পেরেছি। রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতায় বেস্ট অব নেশন অ্যাওয়ার্ড অর্জনকারী নাফিসা সাদাফ আঁচল বলেন, সামনে বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় আরও ভালো করবে। আমি নিজেও কাজ করব দেশের জন্য। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর জন্য যেসব জ্ঞান ও যোগ্যতা দরকার তার সবই আমাদের তরুণদের আছে। প্রয়োজন এর পরিচর্যার। সুযোগ পেলে আমি সেই কাজ করতে চাই। তরুণদের এবং নিজেকে নিয়ে একই স্বপ্ন দেখেন তানজিম তাবাস্‌সুমও। আর তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ! উল্লেখ্য, কাজান শহর ২০১৩ সালের আন্তর্জাতিক গ্রীষ্মকালীন বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ২০১৪ সালের বিশ্ব অসিক্রীড়া শিরোপা প্রতিযোগিতা ও ২০১৫ সালের বিশ্ব জলক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। এটি ২০১৭ ফিফা কনফেডারেশনস কাপের আয়োজক ছিল এবং ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক শহর।