সুপ্রিমকোর্টের করিডোর দিয়ে যখন হেঁটে যেতেন তার পাশে থাকতেন চৌকস আইনজীবীরা। চারপাশ থেকে সালাম আর অভিবাদনের ঝড় বইতো। আদালতের এক ভবন থেকে আরেক ভবন, এক কোর্ট থেকে আরেক কোর্ট –দিনভর ব্যস্ততা- ছুটোছুটি । দেশের বড় বড় আর জটিল মামলার সমাধানে অ্যামিকাস কিউরির ডাক পেতেন হাইকোর্ট কিংবা আপিলবিভাগে। দোতলায় চেম্বারে যখন বসতেন সেখানেও মক্কেলদের ভিড়, ব্যস্ততা। কখনও বড় বড় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তারা তার শরণাপন্ন। কখনও বা আলোচিত কোন মামলায় হার-জিত নিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরাদের ভিড়। তিনি খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক। প্রায় পাঁচ যুগ ধরে আইনপেশায় নিরলস যাত্রা । এখন ৮৫ বছরে পড়ছেন। বয়স আর অসুস্থতায় একসময়ের দাপুটে এই আইনজীবী এখন অনেকটাই গৃহবন্দী। দিনরাত কর্মব্যস্ত মানুষটির এখন সময় কাটে নিভৃত্বে। সমবয়সী বন্ধু আর সহকর্মীরা হয় বেঁচে নেই কিংবা অসুস্থ। একমাত্র ছেলে পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে। ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আর গৃহকমীরাই এখন তার সময়ের সঙ্গী। সময় কাটছে শুয়ে বসে বা টিভি আর পত্রিকার ওপর ভর করে।
বেলা ১১ টা। নিজের শোবার ঘরে বিছানার পাশের চেয়ারে বসে টিভি দেখছেন প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক। গেল কয়েকমাস ধরেই এই ঘরে অনেকটা নীরবে, নিভৃতে অবসর সময় কাটাচ্ছেন তিনি। অসুস্থ রফিকুল হকের সঙে দেখা করতে তার পুরান পল্টনের বাসায় গেলে এই প্রতিবেদকে দেখে খানিকটা খুশি হয়ে তিনি বলেন, তুই ভাল আছিস? বোস আমার পাশে।

কেমন আছেন স্যার ? এই প্রতিবেদকের প্রশ্নে একগাল হেসে ব্যারিস্টার রফিক ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, ’এইতো, মরার সময় গুনছি আরকি।’

আপনি তো আজকাল কোর্টে কম যান। নতুন মামলা কী নিচ্ছেন? জানতে চাইলে বলেন, নাহ, পেন্ডিং মামলাগুলোই শেষ করছি। কোর্ট কোন কারণে ডাকলে যাই মাঝে সাজে। জুনিয়ররাই সব সামলাচ্ছে। আমি আর ক’দিন, কবরে পা ঢুকে গেছে।’

কে দেখভাল করছে আপনার? বলার সঙে সঙেই তাকালেন তার পেছনে দাঁড়িয় থাকা গাড়িচালক আবু বক্করের দিকে। বললেন, ওই সব করে, সারাক্ষণ আমার সাথে থাকে।

অসুস্থতার কথা জানতে চাইলে ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেন, আমার বয়স জানো? ৮৫ বছর। আমার বয়সী আর কেউ নেই সুপ্রিমকোর্টে। আমার চেম্বারের জুনিয়রদের মধ্যে চার চারজন প্রধান বিচারপতিও ছিলেন। আর কত? এখন মৃত্যুর প্রহর গুনি। আগে থেকেই বড় একটা অপারেশন ছিল বুকে। বছর খানেক আগে হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে। চলাফেরা করতে সমস্যা। তাছাড়া এমনিতে ভালই আছি।

সারাদিন কিভাবে কাটছে? আদালতপাড়া কি মিস করেন? জানতে চাইলে বলেন, কোন কিছু নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। এই টিভি দেখি -রাতে ১১টায় শেষ খবর দেখি। সেখানেও শুধু লাশের খবর। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মরছে। নুসরাতের মরে যাওয়া দেখলাম, ওই শয়তান মাদ্রাসা অধ্যক্ষের খবর দেখি। প্রতিরাতে ঘুমাতে যাই এমন অনেক দু:সংবাদ নিয়ে। ভাবতে না চাইলেও ভাবনা এসে যায়।

রাজনীতি ও দেশ সম্পর্কে জানতে চা্ইলে তিনি বলেন, ’আমার এখন মরার বয়স হয়েছে। দেশ -রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করি না। ভাবিও না। আগে ভাবতাম। কথা বলতাম। এখন আর বলি না। বলতে চাইও না।

লেখালেখি বা আত্মজীবনীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কি আর লেখালেখি করবো? মরার সময় হয়েছে। এখন আর কি। মরার সময় কিসের প্ল্যান? এখন চিন্তা কবরের। বনানী কবরস্থানে স্ত্রীর কবরের পাশে নিজের জায়গাও প্রস্তুত রেখেছি। সেখানে যাই মাঝে সাজে।

বন্ধু-বান্ধবের অধিকাংশই তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বন্ধু –বান্ধব সব মরে গেছে। দেখা করতে আসার কেউ নেই। একমাত্র নাতনী দেশে এসেছে কদিনের জন্য।

জীবনের সব অর্জন হাসপাতালসহ বিভিন্ন চ্যারিটি ফান্ডে দিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমার সমস্ত অর্জন চ্যারিটিতে দিয়ে দিয়েছি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের মধ্য থেকে চারজন প্রধান বিচারপতি হয়ে অবসরে গেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকও আমার জুনিয়র ছিলেন। আমার জুনিয়রদের মধ্যে কমপক্ষে চারজন আছেন যারা দেশের প্রধান বিচারপতি হয়েছেন।

গত ত্রিশ বছর ধরে ব্যারিস্টার রফিকুল হকের সঙে আছেন তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক আবু বক্কর । তিনি জানালেন অনেকটা নি:সঙ্গ ব্যারিস্টার রফিক। তার সমবয়সী বন্ধু-স্বজনরা কেউ বেঁচে নেই। অনেক আগেই স্ত্রী মারা গেছেন ক্যান্সারে। একমাত্র ছেলে তার পরিবার নিয়ে এখন বিদেশে। বাসার বাবুর্চি আর কাজের লোকেরাই তার সঙ্গী এখন। এছাড়া মাঝে সাঝে মামলা সংক্রান্ত কাজে কিছু আইনজীবীর যাতায়াত আছে।

ব্যারস্টিার রফিকুল হকের এই সার্বক্ষণিক সঙ্গী বলেন, স্যারের শরীরে দুটি বড় অস্ত্রোপাচার হয়েছে। বাম পায়ের হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের পর থেকে আর স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছেন না। পায়ে ব্যথাও আছে। যে কারণে হুইল চেয়ারে করে চলাফেরা করতে হচ্ছে।

কিন্তু অসুস্থতা বা বার্ধক্য তাকে শারীরিকভাবে কাবু করলেও মানসিকভাবে তিনি এখনও দারুন শক্ত। এখনও রাত জেগে বই- পত্রিকা পড়েন। টিভি দেখেই দিনের বেলা সময় কাটে তার। পারতপক্ষে বাসা থেকে বের হননা তিনি। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তিনি রুমের মধ্যেই রেখে দিয়েছেন। সফেদার মত কিছু ফল , মুরগী আর মাছের ঝোলের ভাত তার খুব প্রিয়। এখনও রুচি করে পরিমিতভাবে সব খান। পুরনো মামলার মক্কেলরা আসেন হুটহাট। তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

বক্কর আরও জানান, ’স্যার বেশিরভাগ সময়ই বাসার দোতলার শোবার ঘরে থাকেন। প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে নিচে নামেন না। কথা বলেন কম। চেম্বারেও বসেন না। মাঝে মধ্যে হুইল চেয়ারে করে নিচে নামেন ।

সূত্র:সারাবাংলা