এ এস এম হোসাইনুর জামান। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ইলেকট্রিশিয়ান সহযোগী হিসেবে ১৯৮৭ সালের ১২ মার্চ তিনি চাকরি শুরু করেন।
সে সময় তার বেতন স্কেল ছিল ৯৬৫ টাকা। চতুর্থ শ্রেণির পদ থেকে দুই দফায় পদোন্নতি পেয়ে এখন চার হাজার ৭০০ টাকা বেতন স্কেলে পিডিবির ভাণ্ডাররক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

এই বেতনে চার ছেলেমেয়েসহ ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার খরচ করে তেমন কোনো সঞ্চয় থাকার কথা নয়। কিন্তু চাকরিজীবনের মাত্র ১৯ বছরেই কোটিপতি বনে গেছেন তিনি। পরিবারের সদস্যরাও বসবাস করছেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে।

চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে তার একটি সাততলা দৃষ্টিনন্দন বাড়ি, কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে রয়েছে দুই ইউনিটের একটি দ্বিতল ভবন, গ্রামে কিনেছেন সাত একর জায়গা-জমি, চট্টগ্রামের অভিজাত মার্কেটে আছে একটি দোকান। তা ছাড়া শেয়ারও রয়েছে শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারের।

কী করে সম্ভব এসব? দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সফিউল্লা বলেন, ’অনিয়ম-দুর্নীতি করে ১৯ বছরে এক কোটি সাত লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, পিডিবির ভাণ্ডাররক্ষক এ এস এম হোসাইনুর জামান।

তদন্ত শেষে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। দুর্নীতিতে সহযোগিতা করায় তার স্ত্রী লুৎফর নাহারকেও মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।’

অবশ্য অভিযুক্ত পিডিবির ভাণ্ডাররক্ষক এ এস এম হোসাইনুর জামান বলেন, ’আমার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ হয়রানিমূলক দুর্নীতির মামলাটি হয়েছিল।’ দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।

ভাণ্ডাররক্ষক জামানের বাবা মোখলেছুর রহমান রেলওয়ে বাংলাদেশের একজন পাম্পচালক ছিলেন। তেমন কোনো সম্পদও নেই তার। দুদকের তদন্ত শেষে চার্জশিটে তুলে ধরা হয়েছে, এ বেতনে সন্তানদের পড়াশোনা ও ছয় সদস্যের ভরণপোষণের পর জামানের বাড়তি অর্থ থাকা কঠিন।

তারপরও পিডিবির ভাণ্ডাররক্ষক জামানের এক কোটি সাত লাখ ৩৯ হাজার ৩৭১ টাকার অবৈধ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

দুদক চার্জশিটে বলা হয়েছে, ১৯ বছরের চাকরিজীবনে জামান চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী হিসেবে সাত বছর ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে ১২ বছর চাকরি করেন। এ সময় তিনি নিজের নামে ও স্ত্রী লুৎফর নাহার জামানের নামে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরের সবুজবাগ আবাসিক এলাকায় ’আরিফ ভবন’ নামে দুই ইউনিটের সাততলা একটি বাড়ি (হোল্ডিং নম্বর ১৯৫৬) নির্মাণ করেছেন, যার মূল্য ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গ্রামের বাড়িতে ১৩ দশমিক ৫ শতক জমি কিনে তিনি পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ডাবল ইউনিটের দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেছেন, যার মূল্য ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া গ্রামে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে তিনি ১০ লাখ টাকার সাত একর ৫৩ শতক জমি কিনেছেন।

চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউড়িতে অবস্থিত ভিআইপি টাওয়ারের ১২৫ নম্বর নাহার শাড়িঘর নামে একটি দোকানের পজিশন কিনেছেন চার লাখ সাত হাজার টাকা দিয়ে। চট্টগ্রাম মাতৃভূমি কমিউনিটি সেন্টারের শেয়ার কিনেছেন দুই লাখ টাকা দিয়ে।

২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে জামান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সফিউল্লা। ২০০৬ সালের ১৮ মে নগরীর হালিশহর থানায় এ দুর্নীতি মামলা করা হয়।

আসামিরা জামিনে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।