গত ৯ জুন ভাটারার বসুন্ধরার জগন্নাথপুর এলাকায় সোহাগ নামের এক যুবকের বাসা থেকে উদ্ধার হয় আনোয়ার হোসেন (৩৫) নামের এক যুবকের লাশ। ঘটনার মোটিভ খুঁজতে পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় আসে বাড়ির মালিক সোহাগ ও তার স্ত্রী । ঘটনার দিন থেকেই পলাতক ছিলেন এই দম্পত্তি।
ঘটনার প্রায় পাচদিন পর রাজধানীর বাড্ডায় হত্যাকাণ্ডের আসামি ফারজানা আক্তার (১৮) ও তার স্বামী সোহাগ শরীফ (২২)গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।গত বুধবার বরিশালের বাবুগঞ্জের নিজ বাড়ি থেকে সোহান শরীফ ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মুলতঃ স্ত্রীকে ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় রাজধানীর ভাটারার দর্জি দোকানের কর্মী আনোয়ার হোসেনকে।  আনোয়ার হোসেনের এ অপকর্মের বিষয়টি কানে আসার পরই খুনের পরিকল্পনা পাকা করে একই দর্জি দোকানের কর্মী সোহাগ ।
আনোয়ার হোসেন ও সোহাগ একই বাসায় দীর্ঘদিন ভাড়া থাকতেন। তারা স্থানীয় স্ট্যান্ডার্স টেইলার্স নামের একটি দোকানে কাজ করতেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকায় তাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সম্প্রতি ছোট ছোট বিষয় নিয়ে দু’জনের স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত রেষারেষি শুরু হয়। পরে গত মাসে তারা আলাদা বাসা ভাড়া নেন।
সোহাগ ও তার স্ত্রী আনোয়ার হোসেনকে অভিভাবকের মতো মানতেন। সোহাগের বাবা না থাকায় আনোয়ারকে বাবা বলে ডাকতেন। ঘটনার তিন দিন আগে ৬ জুন তারা একসঙ্গে দোকানে কাজ করছিলেন। সোহাগকে না জানিয়ে তার বাসায় যান আনোয়ার। স্ত্রীকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন আনোয়ার। পরের দিন সোহাগ বিষয়টি জানতে পারেন।
’’ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে স্বামীকে নিয়ে ধর্ষককে খুন করেন ফারজানা আক্তার (১৮)। ধর্ষক মা বলে বাসায় ঢুকে এই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন। খুন করা ছাড়া তাদের (ফারজানা ও তার স্বামী) কোন রাস্তা ছিলো না। ধর্ষণের ব্যাপারটি স্বামী-স্ত্রী কাউকে বলতেও পারছিলেন না, সইতেও পারছিলেন না।’’ আনোয়ারের এই পশুত্ব মেনে নিতে পারেননি সোহাগ। পরে আনোয়ারকে হত্যার পরিকল্পনা করে দম্পত্তি ।
স্ত্রীকে ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে  সোহাগ গত ৯ জুন ভাটারার বসুন্ধরার জগন্নাথপুর এলাকায় নিজের বাসায় ইফতারের দাওয়াত দেন আনোয়ার হোসেনকে। এর ঠিক তিন দিন আগে এই বাসায়ই সোহাগের অনুপস্থিতিতে স্ত্রীকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে আনোয়ার। পরে বিষয়টি ফাঁস না করার জন্য হুমকিও দেয়। বলা হয়, জানাজানি হলে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই হত্যা করা হবে। ইফতারের দাওয়াত পেয়ে আনোয়ার বাসায় আসার পরই সুযোগ বুঝে তাকে হত্যা করে লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।
নিহতদের স্বজনদের বরাত দিয়ে পুলিশ বলেন, ইফতারের দাওয়াত দেয়ার পর থেকেই আনোয়ার নিখোঁজ ছিলেন। পুলিশের ধারণা, আনোয়ারকে মাথায় আঘাত করে হত্যার পর তার লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। নিহত আনোয়ারের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার লক্ষণদিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আবুল হোসেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডিএমপি ডিবির যুগ্ম-কমিশনার আব্দুল বাতেন এক সংবাদ সম্মেলনে আসামীদের স্বীকারোক্তি জানিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানেই বেরিয়ে আসে এই হত্যাকান্ডের পেছনে চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
আব্দুল বাতেন বলেন, ’’জিঙ্গাসাবাদে ফারজানা বলেছেন, আনোয়ারকে আমরা মামা ডাকতাম । মামার দোকানে ট্রেইলারের কাজ করতেন আমার স্বামী । আনোয়ার মামার পরিবার ও আমরা একসঙ্গে থাকতাম। হঠাৎ মামার পরিবারের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া হয়। এরপর আমর অন্য জায়গায় চলে আসি । আনোয়ার মামা অনেক ইয়াবা খেতেন।’’
’’ফারজানা জানান, আনোয়ার মামা আমাকে মা বলতেন। কিন্তু তার ভেতর যে এত বড় শয়তানি ছিলো, তা আমি আগে বুঝিনি। গত ৬ জুন বিকেলে আনোয়ার মামা আমাদের নতুন বাসায় যান। তিনি বাসায় ঢুকতে চাইলে আমি বলি, মামা বাসায় তো কেউ নেই পরে আসেন। তখন তিনি ’মা মা’ ডেকে জোর করে আমার বাসায় ঢুকেন। আমাকে রোজা অবস্থায় ধষর্ণ করেন এবং ভয় দেখিয়ে বলেন কাউকে জানালে তোর স্বামীকে খুন করবো’ ।
আমি ভয়ে কাউকে কিছু বলিনি। আমার স্বামী বাসায় এলে তাকে বলি, আমরা আর এখানে থাকবো না। সে বললো, কেন, কী হয়েছে? আমি বললাম, আনোয়ার মামা তোমাকে মেরে ফেলেছে আমি স্বপ্ন দেখেছি।’’
আটক স্বামী- স্ত্রীর বরাত দিয়ে আব্দুল বাতেন আরো বলেন, ’’ফারজানা জানান, এসময় আমি আমার স্বামীকে  জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করি । এরপর স্বামীর অনুরোধে স্বামীকে ঘটনা খুলে বলি । আমার কান্না দেখে আমার স্বামীও অনেক কাঁদে। পরে দুজনেই  সিদ্ধান্ত নিই একসঙ্গে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করবো। তবে আত্মহত্যার আগে আনোয়ারকে খুন  করবো । ’
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল বাতেন   বলেন, ’ সেই পরিকল্পনা মতো ৯ জুন আনোয়ারকে বাসায় ইফতারের দাওয়াত দেন স্বামী-স্ত্রী। আনোয়ারকে ইয়াবা খেতে দেওয়া হয়। পরে তাকে দুজন মিলে ছুরি দিয়ে খুন করে গলায় রশি দিয়ে ঘরে ঝুলিয়ে রাখেন। তারাও মরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রক্ত দেখে ভয় পান স্বামী-স্ত্রী। পরে বাসা থেকে পালিয়ে যান তারা।’ somoyerkonthosor