গাজীপুর শিল্পনগরী টঙ্গী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রায় শতাধিক পেশাদার ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ১৫-২০টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা রাস্তায় নেমে সুযোগ বুঝে খুন, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আর এসব অপরাধীদের হাতে থাকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়ান্ত্র, পিস্তল, রিভলভার, কিরিচ, চাপাতি ও ছোরা। দামি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে করে তারা রাতদিন পুরো এলাকা দলবেঁধে চষে বেড়ায়। বর্তমানে গাজীপুরের ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিত শিল্পনগরী টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ ছিনতাইকারী মাঠে নেমেছে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাপ্ত তথ্যে জান যায়, বর্তমানে টঙ্গীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। গত ৬ মাসে কমপক্ষে ১৮/২০টি খুন, ডাকাতি, অপহরণ, চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিরাতে টঙ্গীর শিল্প এলাকার কমপক্ষে ১৫/২০টি স্থানে গণহারে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
টঙ্গীতে থানা পুলিশের তালিকায় নাম রয়েছে প্রায় শতাধিক ছিনতাই ও অপরাধীর নাম। সিনিয়র ও জুনিয়র গ্রুপে ভাগ হয়ে এরা ছিনতাই করে বেড়ায়। ছিনতাই করার আগে অপরাধীরা গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়। এর পর প্রাইভেটকার ও মোটর সাইকেল নিয়ে তারা শিকার খুঁজকে বেরিয়ে পড়ে। জুনিয়র গ্রুপকে পাহারায় থাকে দলের শীর্ষ নেতারা। ফোন পাওয়ার সাথে সাথে তারা দামি গাড়ি নিয়ে স্পটে ছুটে যায়। কোনো ঝামেলা হলে তারা গাড়ি থেকে গ্লাস খুলে গুলি করে। পরে ছিনতাইকৃত টাকা দলনেতা থেকে শুরু করে সব সদস্য মিলে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
টঙ্গী মডেল থানা এলাকায় বসবাস করে এমন শতাধিক সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও অপরাধীর নাম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা সূত্রে পাওয়া গেছে। টঙ্গী এলাকার প্রায় ১৮/২০টি স্পটে অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড হয়। সে স্পটগুলো হলো টঙ্গী বাজার, বাটা গেইট, টঙ্গী ব্রিজ, স্টেশন রোড, ভরান, আনারকলি ও বউবাজার এলাকায় যারা ছিনতাই করে বেড়ায় তারা হলো- সোহাগ, তুষার, ফয়সাল, বুশ, খলিল, রাসেল, জনী, দাঁতভাঙা রাসেল, দেলু, পাপ্পু, রাজীব, রুবেল, হারুন। উওরার রাসেল, শাহীন, ইমরান, পিচ্চি রহিম, চিটার বাবু, ভাতিজা সোহেল।
টঙ্গী নতুন বাজার এলাকার ছিনতাইকারীরা হলো- শুক্কুর, সাইফুল, ভুট্টো, বুলেট, রিপন, কাওসার, খোকন, আলামীন, জাবেদ, বুলু, লিটন, মনির, রকি, পটল বাবু, গলাকাটা সুমন, মতিন। মিরাশপাড়া এলাকার ছিনতাইকারী গ্রুপের সদস্যরা হলো জুয়েল, মীর হোলাম মোস্তাফা ওরফে মোস্তফা, হাসান, পিচ্চি ওরফে জামান ওরফে সাকিব। স্টেশন রোডের ছিনতাইকারীরা হলো মনা, ডিব্বা বাবু, সোর্স রানা। এরশাদ নগর ও চেরাগআলী, কলেজ গেইট, হোসেন মার্কেট, গাজীপুরা ও বাঁশপট্টি এলাকায় যারা ছিনতাই করে বেড়ায় তারা হলো গদা রতন, পিচ্চি রাজু, কাজল, দিলা, তারা, হাসান, বিলাই আলমগীর, রনি, রাকিব, গরম, মাস্টার রিপন, ছোট জয়নাল, আইকা সুমন, বিপ্লব, রুমান, পলাশ, জনি, কামাল, সোহাগ, শাওন, সেন্টু, সুলতান, রকি, সেলিম, বিল্লাল, চিকনা আলামিন ওরফে কংকাল আল আমিন।
তুরাগের কামার পাড়া এলাকায় যারা ছিনতাই করে বেড়ায় তার মধ্যে রয়েছে ওয়াসিম, রাসেল, মোশারফ, সবুজ, মাসুদ, মারুফ, রিপন, করীম, মালেক, লাদেন সোহেল, বিল্লাল, রিপন, আলামিন, রব, আলাল, জাহাঙ্গীর, মজিবুর, নাসির, আফিল, জজ মিয়া, সেন্টু, সুজন।
উওরা এলাকার ছিনতাইকারী গ্রুপের সদস্যরা হলো- রানা, জাহাঙ্গীর, সোহেল, রতন, করীম, মতিন, বাবু, টিটু, কালা রতন, স্বপন, টিটো। উওরখান এলাকায় সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীরা হলো- হাতকাটা সোহেল, শিপলু, পাগলা মনির, সাজ্জাদ, বাদল, রতনসহ ৪/৫ জন। দক্ষিণখানে ছিনতাইকারী ও অপরাধীরা হলো- ডিব্বা মাসুদ, ইসমাইল, মামুন, কামরুল, সাইদুর, টাইটার আজিজ, মুকুল, মহসীন, মোস্তফা, মোশারফ, রাসেল, মিঠুন, দেলোয়ার, ছোট মামুন, হাবিব, আরিফ, মাসুদ, রনি, ইসমাইল, সুমন, কাজল, মোজাইদুল রহমান।
উত্তরায় যে সব স্থানে ছিনতাই হয় সে স্পটগুলো হলো জসীম উদ্দিন রোর্ড, রাজলক্ষ্মী মার্কেট, ৪নং সেক্টর মাঠ, জয়নাল মার্কেট, মাসকট প্লাজা, রবীন্দ্র সরণী, সোনারগাঁও জনপথ সড়ক, আব্দুল্লাহপুর, দলিপাড়া, ৩নং সেক্টর খেলার মাঠ, ১১নং চৌরাস্তা, স্লুইচ গেইট, আজমপুর। তুরাগের কামার পাড়া, রানা ভোলা, তালতলা, আশুলিয়া চেকপোস্ট, ধউর, বাউনিয়া, খালপাড় ও ১০নং সেক্টর ব্রিজ।
দক্ষিণ খানের যেখানে ছিনতাই হয় সে স্পটগুলো হচ্ছে ফায়দাবাদ, জয়নাল মার্কেট, কাওলা, রেলগেইট, আজমপুর কাঁচাবাজার, কসাইবাড়ি, আশকোনা বাজার, প্রেমবাগান, মোল্লার টেক, চালাবন, দক্ষিণ খান বাজার, জামতলা প্রভৃতি।
উত্তরখানের স্পটগুলো হলো মাজার রোর্ড, হেলাল মার্কেট ব্রিজ, চামুড় খান, তেরমুখ ব্রিজ, মোন্ডা গুদারা ঘাট, রাজাবাড়ি গুদারা ঘাট।
র‌্যাব-১, উত্তরা অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম এই প্রতিবেদককে জানান, চলতি সপ্তাহে একটি বিদেশি রিভলবার ও গুলিভর্তি ম্যাগজিনসহ বাপ্পি নামে এক সন্ত্রাসী ও অস্ত্র ব্যবসায়ীকে টঙ্গী পূর্ব আরিচপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া টঙ্গী নতুন বাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শুক্কুরকে ও র‌্যাব আটক করেছে। সন্ত্রাসী, ডাকাত, অস্ত্রধারী ও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে। আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে র‌্যাব সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে।
টঙ্গী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফিরোজ তালুকদার আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কথা স্বীকার করে বলেন, পুলিশে জনবল কম ও পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তবু আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি।
কয়েক বছর আগে উত্তরায় ছিনতাই করার প্রস্ততিকালে র্যাবের সঙ্গে ছিনতাইকারী গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে ৫ জন মারা যায়। র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে দুইটি পিস্তল, দুইটি রিভলভার, একটি এলজি (পাইপগান) ৫ রাউন্ড গুলি, একটি চাপাতি, একটি ছোরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। সেইসঙ্গে ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত ঢাকা মেট্রো-গ-১৪-০০২৮ নম্বর প্রাইভেটকারটি র‌্যাব উদ্ধার করে।