সরু গলিতে জমাট বাঁধা অন্ধকার। অসীম সাহসে ভর করে সেই অন্ধকার ঠেলে সামনে বাড়তেই ছোট ছোট ঘর। সব ক\\\’টার দরজা আটকানো। গুমোট পরিবেশে রীতিমতো দম বন্ধ হওয়ার দশা। শিরদাঁড়া বাইছে ভয়ের স্রোত।
জানাল‍ার ফাঁক গলে ভেতরে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। আধো আলোয় স্পষ্টই চেনা গেলো সিরিঞ্জগুলো। নিচে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির খামাল। ওগুলোতে অপদ্রব্য ভরা হচ্ছে সিরিঞ্জ দিয়ে। মুনাফা লোভীদের হাতে একি হাল হচ্ছে সাদা সোনার!

প্রতি রাতেই খুলনার প্রায় তিনশ\\\’ স্থানে এমন মচ্ছব চলছে গলদা আর বাগদা চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর অবধি সিরিঞ্জ দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ফিটকিরির পানি, ভাতের মাড়, সাগু, এরারুট, লোহা বা সীসার গুলি, মার্বেল, ম্যাজিক বল, জেলিসহ বিভিন্ন পদার্থ। এরপর এসব মাছ যাচ্ছে ঢাকার সাভার, সদরঘাট, কারওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। অপদ্রব্য পৃশ করা এই চিংড়ি খেয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মানুষের লিভার আর কিডনি। দেখা দিচ্ছে অরুচিসহ নানা সমস্যা।

একই সঙ্গে এসব অপদ্রব্য পুশের কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম হারাচ্ছে চিংড়ি। ফ্রান্স, চীন, জাপান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম, তাইওয়ান, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, মরিশাস, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া ,সাইপ্রাস ও ডেমোনিক্সন রিপাবলিকে রপ্তানি করে হিমায়িত চিংড়ি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হলেও অপদ্রব্য পুশের দুর্নামে এখন বাজারই নষ্ট হতে বসেছে।

এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসেছে অপদ্রব্য পুশ করা চিংড়ির চালান। কিন্তু লাগাতার অভিযান চালিয়েও চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করা বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

অপদ্রব্য পুশের কারণ
ঘের থেকে চিংড়ি মাছ ধরার পর চাষীরা তা বিক্রি করেন ব্যবসায়ী বা ডিপো মালিকদের কাছে। চিংড়ির ওজন বাড়িয়ে অধিক লাভের আশায় ডিপো ও বিভিন্ন গোপন স্থানে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পুশ করেন জেলিসহ বিভিন্ন অপদ্রব্য।

চিংড়ির দেহে যা পুশ করা হয়
অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় চিংড়ির দেহে ফিটকিরির পানি, ভাতের মাড়, সাগু, এরারুট, লোহা বা সীসার গুলি, মার্বেল, ম্যাজিক বল, জেলিসহ বিভিন্ন ধরনের পদার্থ মিশিয়ে দেন। এর মধ্যে জেলি, সাগু, পাউডার ও সাদা লোহা জাতীয় দ্রব্য গলদা চিংড়িতে বেশি পুশ করা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ওজন বাড়াতে পানিতে চিংড়ি ভিজিয়েও রাখা হয়।

যেসব এলাকায় পুশ করা হয়
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খুলনা মহানগরীর রূপসা নতুন বাজার, রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসা, ইলাইপুর ও শিয়ালি বাজার, ফুলতলা উপজেলার জামিরা বাজার, ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর বাজার, খর্নিয়া বাজার, ফকিরহাটের ফলতিতা বাজার, কয়রা উপজেলার ৭টি চাতালসহ বিভিন্ন এলাকার মৎস ডিপোতে অবাধে চলছে চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে চিংড়ির দেহে বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল ঢুকিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

পুশের উৎপত্তি
৯০ দশকের শেষের দিকে প্রথমে সাতক্ষীরা-কালীগঞ্জ এলাকার ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করা শুরু করেন। এরপর একে একে ছড়িয়ে যায় খুলনার বিভিন্ন স্থানে।খুলনায় চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের দৃশ্য। ছবি: মুন্না

পুশ শ্রমিকদের নাম ডাক্তার
পুশ শ্রমিকদের ডাক্তার নামে ডাকা হয়। কেননা তারা সিরিঞ্জ ব্যবহার করেন। বিভিন্ন মাছের ঘরে পুশ করার জন্য বিকল্প ঘর রয়েছে। তবে যেসব ঘরের নিজস্ব পুশব্যবস্থা নেই তারা ওই জেলি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা করে পুশ করিয়ে নেন। এভাবে এক একটি পুশ সিন্ডিকেট প্রতিদিন কমপক্ষে ৪-৫ মণ মাছ পুশ করে।

পুশে জড়িত যারা
শিশু ও নারী শ্রমিকদের চিংড়িতে পুশ দেয়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর এদের দিয়ে পুশের কাজ চালানো হয়। পুশের অভিজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে পরিচিত পশ্চিম রূপসার নতুন বাজার এলাকার আসুবর, শরীফুল, কাইয়ুম, মিঠুর স্ত্রী, ছেলে আমির, জামির। পুশের সাথে জড়িত টুলু, পানি শোষনাগারের পেছনের খাস জমি দখল করে আজু, পূর্ব রূপসার রাজু।

জেলার কয়রা, ডুমুরিয়া ও রূপসা উপজেলায় একাধিক সিন্ডিকেট এ কাজে তৎপর। পূর্ব ও পশ্চিম রূপসা উপজেলায় প্রায় চারশ\\\’ ডিপোতে বাগদা ও গলদা চিংড়িতে ভেজাল মেশানো হচ্ছে বহু বছর ধরে। কয়েকজন অসাধু হিমায়িত মৎস্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এ পুশ ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে ছোট ছোট ব্যবসায়ী ফড়িয়া থেকে শুরু করে ডিপো-মালিক, মধ্যভোগী এজেন্ট ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় প্রতিনিয়ত চিংড়িমাছে অপদ্রব্য পুশ করে চলছে। বর্তমানে খুলনার এমন কোন চিংড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই যারা কমবেশী পুশের সাথে জড়িত নেই।

পুশের দ্রব্য কোথায় বেচে
একটি বিশেষ সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে অবৈধ পথে আসা দু\\\’ধরনের পাউডার মিশ্রিত করে ওই জেলি পাউডার তৈরি করে বাগদা ও গলদা মাছের দেহে পুশ করা হয়। খুলনার হেরাজ মার্কেটের বিভিন্ন ওষুধের দোকান থেকে একটি সিন্ডিকেট কিনে এনে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মাঝে সরবরাহ করে। বর্তমানের এই জেলি অত্যন্ত আঠালো হওয়ায় সহজে এসব পুশ মাছ ধরা পড়ে না।চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের দৃশ্য। ছবি: মুন্না

কেজিতে কতটুকু পুশ হয়
নাম না প্রকাশের শর্তে পুশের সাথে জড়িত এক ব্যক্তি বলেন, কেজিতে ১শ\\\’ থেকে ২শ\\\’ গ্রাম অপদ্রব্য পুশ করা যায়। এতে দাম বেড়ে যায় মাছের গ্রেড হিসেবে।

পুশ করা মাছ যেখানে যায়
অধিক লাভের আশায় ওজন বাড়ানোর জন্য সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির দেহে অপদ্র্রব্য ঢুকিয়ে বিভিন্ন মাছ কোম্পানিতে বিক্রি করা হচ্ছে। এ রকম মাছ কোম্পানির সংখ্যা খুলনায় বর্তমানে ২১টি। এসব মাছ ঢাকার সাভার, সদরঘাট, কারওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানের আড়ত ও মাছ কোম্পানিতে চালান করা হয়।

হুমকির মুখে রফতানি
অপদ্রব্য মেশানোর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক খাত চিংড়ি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। গলদা ও বাগদা চিংড়ি দিন দিন বিদেশের বাজার হারাচ্ছে। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অপদ্রব্য পুশকৃত চিংড়ি ধরাও পড়ছে। পরে এসব চিংড়ি নষ্ট এবং পুশকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হচ্ছে। অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চলে যাচ্ছে পুশকৃত চিংড়ি। এতে এ শিল্প সুনাম হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি।

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর
চিংড়িতে মেশানো অপদ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। খুলনা সিভিল সার্জন এস এম আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, অপদ্রব্য পুশ করা চিংড়ি খেলে লিভার, কিডনি ড্যামেজ হয়ে যেতে পারে।

অভিযানে জরিমানা
ম‍ৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দফতর খুলনার উপ-পরিচালক প্রফুল্ল কুমার সরকার বৃহস্পতিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলানিউজকে বলেন, চিংড়িতে পুশ বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত এক বছরে মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রন বিভাগ এবং র‌্যাব-পুলিশ মিলে ১৮৫টি অভিযান চালিয়েছে। অভিযুক্ত ৯ জনকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বিভিন্ন মাছের ডিপোকে। পুশের দায়ে বিভিন্ন কোম্পানিকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
banglanews24