ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ২৫০০০ টাকা বেতন দিয়ে। আপাতত তার মাসিক মাইনে ১৫০০০ টাকা। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস করে বর্তমানে আহমেদাবাদে জুতা বিক্রিতে ব্যস্ত ডাক্তার দশরথ কেলা।
ছাত্র হিসেবে বরাবর মেধাবী ছিলেন আটত্রিশের দশরথ। পাকিস্তানে গোটা ছাত্রজীবনে শিক্ষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যথাসময়ে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর ডাক্তারি পেশার শুরুতে মাসিক ২৫০০০ টাকা বেতনের লোভনীয় চাকরি। কিন্তু নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় ২০০৬ সালে দেশ ছাড়া কাল হয় তার। ভারতের মেডিক্যাল কাউন্সিল চিকিত্‍সক হিসেবে তাকে অনুমোদন দেয়নি। বাধ্য হয়ে তাই এক আত্মীয়ের জুতার দোকানে কাজ নিয়েছেন তিনি।
শুধু কেলা-ই নন, গুজরাটে আপাতত পাক-ফেরত চিকিত্‍সকের সংখ্যা অন্তত ২০০ জন। মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার শংসাপত্র ছাড়া এদেশে চিকিত্‍সা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।
পেট চালাতে তাদের কেউ কেউ কাজ খুঁজে নিয়েছেন ফার্মাসিতে। আবার দশরথ কেলার মতো হতভাগ্য অনেকে মোবাইল মেরামতিকেও পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিছু সাবেক পাক চিকিত্‍সক আবার ইনের চোখে ধুলো
দিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নাইট ডিউটিতে মোতায়েন হয়েছেন।
বেশির ভাগ পাকিস্তানি চিকিত্‍সক নিরাপত্তার অভাব বোধ করে সীমান্ত পেরিয়ে গুজরাটে স্থায়ী হয়েছেন। অভিযোগ, হিন্দু পরিবারগুলোর ওপর অকথ্য অত্যাচার হওয়া সত্ত্বেও উদাসীন পাক সরকার। নারী পাচার থেকে তোলা আদায়ের মতো অপরাধ প্রকাশ্যে ঘটলেও অভিযোগ দায়ের করে বিশেষ লাভ হয় না।
শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিরাপত্তার অভাবে কয়েক পুরুষের ভিটে আর পেশাগত সাফল্য ছেড়ে পরিবার নিয়ে ভারতে স্থায়ী বসবাস শুরু করতে বাধ্য হন চিকিত্‍সকরা।
পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে চিকিত্‍সক হিসেবে অসামান্য সাফল্য লাভ করেছিলেন বছর ছেচল্লিশের জয়রাম লোহানা। প্রতি মাসে লাখ টাকা রোজগার ছিল। চেম্বারে রোগীর ভিড় উপচে পড়তো। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে ২০১২ সালে পাকিস্তান ছাড়েন।
লোহানা জানিয়েছেন, পাকিস্তানে রোগীদের চোখে আমরা ঈশ্বরের মতো ছিলাম। এদেশে বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষা করতে হচ্ছে। জঙ্গিদের হাত থেকে পালিয়ে এদেশে নিরাপদে রয়েছি কিন্তু পুরনো পেশায় ফিরতে কেউ সাহায্য করেননি।
বর্তমানে এক আত্মীয়ের মোবাইল ফোনের দোকানে কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত ডাক্তার লোহানা। তবে বেসরকারি এক সেবা প্রতিষ্ঠানে মাসিক ২০,০০০ টাকার বিনিময়ে রোগী দেখার সুযোগ পেয়েছেন এই চিকিত্‍সক।
গ্রামীণ এলাকায় চিকিত্‍সা করতে চেয়ে আবেদন করেছিলেন লোহানা। তিনি ভারতীয় নাগরিক না হওয়ার কারণে এমসিআই তা নস্যাত্‍ করেছে।
এমসিআইয়ের চেয়ারম্যান জয়শ্রী মেহতা জানিয়েছেন, ভারতে চিকিত্‍সা করতে হলে বিদেশি ডিগ্রিধারী চিকিত্‍সকদের প্রথমে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে হবে এবং এরপর বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় পাস করতে হবে।’
মুশকিল হলো, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা বেশির ভাগ চিকিত্‍সকেরই ভারতের নাগরিকত্ব মেলেনি। আইন অনুসারে, এদেশে ৭ বছর বসবাস করার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানাতে পারেন পাকিস্তানের বাসিন্দারা। তাই দীর্ঘমেয়াদি ভিসা-ই তাদের সম্বল।
এছাড়া নাগরিকত্ব জোগাড় করতে পারলেও লাল ফিতের ফাঁস পেরিয়ে এমসিআইয়ের অনুমোদন মেলা এক কথায় অসম্ভব। দুই বা তিন বছর পার হয়ে গেলেও চিকিত্‍সক হিসেবে স্বীকৃতি অধরাই থেকে যায়।
এদিকে সংসার চালানো বড় দায়। সেই কারণে বিকল্প যেকোনো পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন একদা সফল চিকিত্‍সকরা। সূত্র : এই সময়