’বছর পাঁচেক আগে হুজুরের কক্ষে একদিন ঢুকে লজ্জায় ডুবে যাই। এক ছাত্রীর সঙ্গে তাকে অশালীন অবস্থায় দেখে ভয় পেয়ে যাই। দৌড়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসি। ভাবতে থাকি, ছোট চাকরি করি। হুজুরকে ওই অবস্থায় দেখে ফেলায় হয়তো কোনো অজুহাতে চাকরি খেয়ে ফেলবেন। পরে অবশ্য আমার চাকরি তিনি খাননি। তবে ঘটনা প্রকাশ করলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর থেকে ছোটখাটো ভুলত্রুটি হলেই শাসাতেন। নাইট গার্ডের চাকরি করলেও দিনেও কাজ করাতেন তিনি। তখন বুঝতাম, এটা হয়তো আমার দেখে ফেলার শাস্তি।’
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার নাইট গার্ড মো. মোস্তফা গতকাল শুক্রবার এভাবেই তার তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। এই মাদ্রাসার কুখ্যাত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার একান্ত বিশেষ সহকারী নুরুল আমিনের বক্তব্যেও মিলেছে মোস্তফার তথ্যের সত্যতা। অনুসন্ধানেও বেরিয়ে আসে, শৈশব থেকেই নারীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছেন অধ্যক্ষ। ফেনী সদরের গোবিন্দপুর ছিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালেও একাধিকবার অনৈতিক সম্পর্কে জড়াতে গিয়ে তিনি এলাকাবাসীর পিটুনি খান। খবর সমকাল

নাইট গার্ড মোস্তফা একই ধরনের আরও অন্তত তিনটি ঘটনার সাক্ষী। তার বক্তব্যে উঠে আসে অধ্যক্ষ সিরাজের রুমে ডাক পড়লেই বিপদের গন্ধ পেত ছাত্রীরা। নিপীড়নের শিকার অধিকাংশ ছাত্রী ভয়ে তা প্রকাশ করত না। কেউ কেউ পরিবার ও সহপাঠীদের জানালেও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তা ধামাচাপা দিয়ে ফেলতেন সিরাজ। আবার অধ্যক্ষের পোষা একটি বাহিনী বারবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখাত।

নাইট গার্ড মোস্তফা ২১ বছর ধরে সোনাগাজী মাদ্রাসায় চাকরি করেন। চোখের সামনে অনেক কিছু দেখেছেন তিনি। পাঁচ-ছয় বছর আগের একটি ঘটনা তিনি তুলে ধরেন এভাবে- ’হঠাৎ একদিন দুপুরে হুজুরের রুমে যাই। মাদ্রাসা তখন খোলা ছিল। কক্ষে ঢুকেই দেখি, এক ছাত্রীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করছেন তিনি। আমাকে দেখেই হুজুর আলমারির ভেতরে কিছু একটা খোঁজার ভান করেন। এমন দৃশ্য দেখার পর ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল।’

মোস্তফা আরও বলেন, পরের দিন অধ্যক্ষ তাকে রুমে ডেকে পাঠান। এরপর বলেন, ’জলে বাস করতেছিস। কুমিরের সঙ্গে লড়বি কি-না বুঝে নিস। পাথরের সঙ্গে মাথা ঠোকালে পাথরের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং যে মাথায় ঠোকায় তার রক্ত ঝরে।’ সিরাজের এই কথা শোনার পর ভয় পেয়ে যান মোস্তফা। তিনি বলেন, ’বাইরের কাউকে জানানোর কথা চিন্তাও করিনি। আবার ভেবেছি, যার সঙ্গে ঘটনা ঘটেছে তিনি অভিযোগ না করলে আর আমি বিষয়টি জানালে বিপদে পড়ে যাব। যদি ওই ছাত্রী পরে অস্বীকার করে। আবার হুজুরের বিষয়টি প্রমাণ করতে হলেও তো সাক্ষী লাগবে। সেটা কোথায় পাব আমি।’

ওই মাদ্রাসার নাইট গার্ড আরও বলেন, কয়েক বছর আগে হঠাৎ হুজুর বললেন তার রুমে সাপের বাচ্চা ঢুকে পড়েছে। তখন তার রুম ছিল মাদ্রাসার নিচতলায়। পাশেই ছিল পুকুর। হুজুর সবার কাছে প্রচার করেন, পুকুর থেকে সাপ এসে তার চেয়ারের নিচে বসে ছিল। অল্পের জন্য সাপের কামড় থেকে রক্ষা পান তিনি। এটা প্রচার করার পরপরই অধ্যক্ষ জানান, তার কক্ষ দোতলায় নিতে হবে। আসলে তিনি তার পাপ কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে আরও নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলেন। সাপের কথা বলে সেটা পাকাপোক্ত করেন। যেদিন তার কক্ষ দোতলায় শিফট হয় সেদিন নতুন রুম দেখতে গিয়ে আবারও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। আরও এক ছাত্রীর সঙ্গে অশালীনভাবে তাকে দেখতে পান মোস্তফা। তাড়াহুড়ো করে বাইরে চলে আসেন তিনি।

মোস্তফা বলেন, নুসরাত জাহান রাফির ঘটনার এক মাস আগেই মাদ্রাসায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রীকে হুজুর ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব দেন। যে ছাত্রীর সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছে সে নুসরাতের বান্ধবী। একই ক্লাসে তারা পড়ে। ওই ছাত্রী হুজুরের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। বিষয়টি ওই ছাত্রী বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জানায়। ওই ছাত্রীর বাবা সোনাগাজীতে একটি দাখিল মাদ্রাসার সুপার। পরিবারের পক্ষ থেকে তারা গভর্নিংবডির সদস্য ও মাদ্রাসা-সংশ্নিষ্ট অন্যদের কাছেও অভিযোগ দেন। তবে পরে বিষয়টি আর এগোয়নি।

মোস্তফা জানান, ’অধ্যক্ষ সিরাজ দীর্ঘদিন ধরেই ভয়ঙ্কর পাপ করে আসছিলেন। নুসরাত সাহস করে রুখে দাঁড়িয়েছেন। জীবন দিয়ে নুসরাত অনেক মেয়ের জীবন ও ইজ্জত বাঁচিয়েছেন। তবে নুসরাত বেঁচে থাকলে খুশি হতাম। এখন খুশি হচ্ছি হুজুর ধরা পড়ায়। এখন একটাই দাবি, যেন তার উপযুক্ত বিচার হয়। আবার ভয় লাগে, ছাড়া পাওয়ার পর এসে যদি কোনো ক্ষতি করেন। তার হাতে অনেক প্রভাবশালী লোকজন রয়েছেন। হুজুরের শ্যালক রাজু আছে। সে অনেক প্রভাবশালী। হুজুরের অনুগত নুর উদ্দিন, শাহাদাত ও মাকসুদ রয়েছে।’

নুসরাতের ওপর বর্বর হামলার সময়কার বর্ণনা দিয়েছেন মোস্তফা। তিনি বলেন, ৬ এপ্রিল নুসরাতের ঘটনার সময় মাদ্রাসার প্রধান ফটকে দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে নিরাপত্তা ডিউটি ছিল তার। ওই দিন সকাল ৭টা থেকে সোয়া ৯টা পর্যন্ত মাদ্রাসার ক্লাস চলছিল। ক্লাস শেষে আলিম পরীক্ষার্থীদের তল্লাশি করে মাদ্রাসায় ঢোকানো হচ্ছিল। মাদ্রাসা গেটে মেয়েদের তল্লাশির জন্য ছিলেন মাদ্রাসার কর্মচারী বেবী রানী। মাদ্রাসা গেটে পৌনে ১০টার দিকে এক ছেলে এসে জানান, তার বোন অসুস্থ। কেন্দ্রে ঢুকতে চান তিনি। তখন তাকে হল সুপারের কক্ষে নেওয়া হয়। সুপার তাকে জানান, তার বোনের কোনো সমস্যা হলে তারা দেখভাল করবেন। এরপর ওই ছেলেটি চলে যান। ১০টা বাজার কয়েক মিনিট আগে হঠাৎ এক মেয়ের আর্তনাদ কানে ভেসে আসে। দৌড়ে গিয়ে দেখেন ’আউ আউ’ শব্দে এক মেয়ে (নুসরাত) কাঁদছেন। তার সারা শরীরে আগুন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে মোস্তফা পাপোশ দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। বদনা দিয়ে তার শরীরে পানি ঢালতে থাকেন। কিছু সময় পর মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিনতে পারেন, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যে মেয়েটি অভিযোগ এনেছিলেন সেই তরুণীই হামলার শিকার।

অধ্যক্ষ সিরাজের একান্ত বিশেষ সহকারী নুরুল আমিন সমকালকে জানান, ২৭ মার্চ নুসরাতকে অধ্যক্ষ তার কক্ষে ডেকে আনার নির্দেশ দেন। নুরুল আমিন অধ্যক্ষের এই তথ্য নুসরাতকে জানান। মিনিট দশেক পরে চার বান্ধবীসহ নুসরাত অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে আসেন। এরপর নুসরাত একাই অধ্যক্ষের রুমে ঢোকেন। তার বান্ধবীরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নুসরাত রুমে ঢোকার মিনিট পাঁচেক পর কলিংবেল বাজান অধ্যক্ষ। এরপর রুমে ঢুকে নুরুল আমিন দেখেন, নুসরাত মাথা টেবিলের সঙ্গে লাগিয়ে বসে আছেন। নুরুল আমিনকে অধ্যক্ষ নির্দেশ দেন- নুসরাতের কী হয়েছে তা জানতে। কয়েকবার জানতে চাইলেও জবাব না দিয়ে দৌড়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান নুসরাত। পরে নুসরাত বিষয়টি তার পরিবারকে জানান। ওই দিন মাদ্রাসায় এসে নুসরাতের ভাই ও মা তাকে বাসায় নিয়ে যান।

নুরুল আমিন আরও বলেন, ’অধ্যক্ষের অপকর্মের কথা আগে থেকেই জানতাম। নুসরাতের ঘটনার কিছুদিন আগেই এক ছাত্রীর গায়ে হাত দিয়েছেন তিনি। তাই কোনো ছাত্রীকে ডাকা হলে একাকী তার রুমে ঢুকতে নিষেধ করতাম। তবে কতক্ষণ আর পাহারা দিয়ে রাখা যায়। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অধ্যক্ষ অনেক কিছু ম্যানেজ করে নিতেন। ৩৭ বছর সোনাগাজী মাদ্রাসায় চাকরি করছি। কতকিছু চোখের সামনে দেখেছি। জীবনের ভয়ে আর পেটের চিন্তায় বুক ফাটলেও মুখ ফুটে অনেক কথা বলতে পারিনি।’

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক আবুল কাশেম বলেন, কয়েক বারই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। যারা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে তারাই রোষানলে পড়েছে। হয়রানি ও চাকরি যাওয়ার ভয়ে সবাই চুপ করে থাকত।

ফেনী সদর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শহীদ খন্দকার সমকালকে বলেন, ১৯৮৯ সালে সিরাজ গোবিন্দপুর ছিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার পড়ার সময় সেখানে একটি বাড়িতে লজিং ছিলেন। ওই এলাকার বাসিন্দা শহীদ। তখন তিনি কলেজে পড়তেন। ওই সময় সিরাজ মেয়েদের কুপ্রস্তাব দিলে তাকে বেদম মারধর করে এলাকাছাড়া করা হয়।

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম সমকালকে জানান, ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে ছিলেন তিনি। ওই সময় অধ্যক্ষ সিরাজুলের বিরুদ্ধে ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে এসব ঘটনার তদন্ত আর এগোয়নি। নুসরাত সাহস করে রুখে দাঁড়ানোয় অধ্যক্ষের বিষয়টি এখন সামনে আসছে।

সোনাগাজীর স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের সালামতিয়া মাদ্রাসার এক শিশুকে বলাৎকারেরও অভিযোগ উঠেছিল। এরপর তাকে সেই মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করা হয়।

সূত্র:সমকাল